English version || Bengali version. || Hindi version

১
আজ ০৬ অগাস্ট ২০২৬। মা তখনও ঘুমোচ্ছে, সকাল হয়ে গিয়েছে, মা উঠবে চা বানাবে তার পরই সকালের চা পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যে সকাল বেলাই আমার দুষ্টু-বুদ্ধি চিড়বিড় চিড়বিড় করছে।তখনও মা পুরো চোখ খোলেনি, জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বিয়ে হয়েছিল, মনে আছে?” ওঁর বয়েস কমে প্রায় ৯৫ ছুঁই ছুঁই, কিছু কথা জ্বল-জ্বলে মনে থাকে, কিছু কথা হারিয়ে যায়। এতদিন ধরে মা – কাকিমা হয়ে থেকে কে জানে মূল সূত্রটাই হারিয়ে গেছে কিনা!
মা’র চোখটা যেন তড়িঘড়ি খুলে গেল, বলল, “হ্যাঁ”।
জিজ্ঞেস করলাম ১৯৫১ নাকি ১৯৫২?
উত্তর পেলাম “১৯৫২”।
তারপরই রবিশঙ্করের নাম, উনি বৌভাতে সেতার বাজিয়েছিলেন। ৭৪ বছর পরেও ওই বৌভাতে রবিশঙ্করজীর উপস্থিত সেদিনে উপস্থিত সবার মনেই যেন ঝকঝকে নতুন।
হঠাৎ করে বাড়ীর একটা পুরোন ছবির অ্যালবাম হাতে পেলাম। লাল রংএর মোটা কভার, তাতে সোনালি ডিজাইন, ভেতরে কালো কালো পাতা তার ওপরে ট্রেসিং পেপার, আর ছবিগুলোর চারপাশে সোনালি কর্নার।
কত সব ছবি একবারে পেয়ে গেলাম, আমার তো হাপুস-হুপুস অবস্থা, সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
কোন ছবি আগে স্ক্যান করব, কোনটা এ.আই. দিয়ে কিভাবে প্রসেস করব।
পুরো ব্যাপারটা উত্তেজনা আর কমপ্লেক্সিটিতে গুলে-ঘেঁটে গুড় গোবর হয়ে যাচ্ছে।
আমার মাথায় ভূত ভর করেছে, পাপা আর মায়ের বিয়ের গল্প লিখব। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পর সাকুল্যে বিয়ের একটা ছবি পেলাম, সেটা মায়ের মুকুট পড়া ছবি। মনে পড়ে, ওদের দুজনের একটা ছবি ছোটবেলায় দেখেছিলাম, কিন্তু তার কোন হদিশ পাচ্ছিনে। অগত্যা পাপার একটা অল্প বয়েসের ছবি আর মা-এর বিয়ের ক্লোজআপ পোর্ট্রেট সম্বল নিয়ে এ.এই. যুদ্ধে নেমে গেলাম। যা তথ্য জানা ছিল তার ভিত্তিতে ছবি তৈরি হতে থাকল। ছবিগুলো রঙীন করছিলাম, কিন্তু আমার স্ত্রী বললেন ওটা ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট বা সেপিয়া কর। ১৯৫২তে রঙিনের প্রচলন ছিলনা।
২

সেদিন ডিসেম্বর মাসের ১ তারিখ, কলকাতায় বেশ ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব। অল্প করে সালটা জড়িয়ে নিলে বেশ লাগছে। ১৯৫২র সেদিন পাপা ও মা দুজনেই দুরকম অস্থির, সব কিছু অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। আবাসে থাকা, মনে বাড়ির নাম “আবাস”, আর সেখানেই বিয়ে।
হ্যাঁ, এক্কেবারে ঠিক, মা আর পাপার বিয়ে!
ওইদিনই রবিশঙ্করজীও ছাত্রের বৌভাতে বাজাবেন কথা দিয়েছেন ।
পিসি রান্না ঘরে রবুজীর জন্য বিশেষ রান্নায় ব্যস্ত।
আত্মীয়-স্বজনে বাড়ী ভর্তি, কেউ তারিফ করছেন, কেউ খুঁত ধরছেন। বড়দি পিসির বড় চিন্তা, খোকনের বিয়েটা ঠিক-ঠাক হয়ে গেলে শান্তি। দাদুর খুব একটা চিন্তা নেই, তাঁর নিজের বাচ্চাদের প্রতি প্রবল আস্থা। ছোড়দি পিসিও কনফিডেন্ট, ঠাকুর সব ঠিক-ঠাক করিয়ে নেবেন।
পাপার চিন্তা অন্য রকম। ওঁর টেনশন রবুদার কোন অসুবিধে না হয়। পরিমলবাবুকে তবলা বাজানোর জন্যে ঠিক করেছেন, তার ও কোনও টিকির দেখা পাওয়া যাচ্ছেনা; এত বিষম বিপদ। তাহলে কি হবে??!

অবশেষে দুটো গাড়ী এসে গেটের সামনে থামল — রবিশঙ্কর এসেছেন — রবিশঙ্কর এসেছেন।
অবশেষে দুটো গাড়ী এসে গেটের সামনে থামল — রবিশঙ্কর এসেছেন — রবিশঙ্কর এসেছেন।
পুরো বিয়ে-বাড়ী এক দৌড়ে গাড়ীর সামনে।পন্ডিতজী নামলেন, সাথে ওঁর শিষ্য উমাশঙ্করজী।
রবিশঙ্করজীর নতুন বউয়ের সাথে ছোট পরিচয়ের পর বিশেষ ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। পাপার মুখ কাচু-মাচু।
উনি বললেন, “রোবুদা একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে।“
“কি হয়েছে?”
“যাকে আপনার সাথে তবলা বাজানোর জন্যে ঠিক করেছিলাম তার কোন হদিশ নেই! এখন কি হবে?!!”
রবিশঙ্করজী বললেন, “এত টেনশনের কি আছে? উমাশঙ্কর তো এসেছে, ও বাজাবে।“
পাপার যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো।
অনেকেই হয়তো জানেননা যে উমাশঙ্করজী যেমন দারুণ সেতার বাজাতেন, উনি যথেষ্ট ভালো তবলাও বাজাতেন।
এরপর তো কোন কথাই নেই।
রবুজীর বাজনায় পুরো বিয়ে-বাড়ী সুরের ধারায় স্নান করল, শুদ্ধ হল, নতুন বড়-বউয়ের স্বপ্ন দিয়ে ঘর বোনা শুরু হল।
শুনেছি রবুজী পিসির রান্না তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেয়েছিলেন।
ওঁর প্রশংসা শুনে পিসির মুখটা নাকি লাজুক লাজুক হয়ে গিয়েছিল। পিসির সারাদিনের ক্লান্তি এক রাশ খুশি হয়ে মুখের গোলাপী আভায় প্রকাশ পেল।
