শিল্পী-মন, সৃষ্টি-চেষ্টা, বারান্দা, ও ছাদ

তখন ১৯৭২, স্থান রাইফেল ক্লাব ওয়েস্ট, বাঁশদ্রোনী ।

এই সিড়িটা উঠে গিয়েছে এক মন ভোলানো ছাদে, যেখানে ভালোবাসার ব্যথায় বহু চোখ উদাস চোখে আকাশ দেখেছে, কখনও বা বেশ কিছু মানুষ নানা রঙ সুর আর ভালোবাসা মেলানো সৃষ্টিতে মশগুল হয়েছে, কখনও বা কোনও রাগী মন ইঁট-বালিশে শুয়ে রাগ প্রকাশ করেছে – আরও কত জানা-অজানা ভাবের সাক্ষী ওই ছাদ|

মনে পড়ে, গৌরী প্রসন্ন বা শক্তি ঠাকুর, বা শিল্প-ভাবনায় ডুবে থাকা অন্য বহু মন ওই তার-কাঁটা ঘেরা পরিসরে মন উজাড় করে শিল্প সৃষ্টি করেছে| কখনও গান, কখনও কবিতা, কখনও তবলা, বা কখনও নাটক নিচের ঘেরা বারান্দা থেকে ওপরের ছাদ সব মিলিয়ে স্বচ্ছন্দে ছোটাছুটি করে বেড়িয়েছে|

ছোড়দির উঠল বাই কটক যাই স্টাইলে হঠাৎ হঠাৎ সৃষ্টি, মনের খুশিতে গান গাওয়া, কবিতা লেখা, আর অনুষ্ঠানের আয়োজন| সেই অনুষ্ঠানে বাড়ীর মানুষ, প্রতিবেশী শিল্পী আর নাম করা শিল্পীরাও মহা আনন্দে স্বতস্ফূর্ত যোগ দিতেন|   

বড় জ্যাঠার শৈল্পিক মন এতই বিস্তৃত – এত রকমারী – তা ধরে বুঝে নেওয়া কঠিন| গান – সাহিত্য – পাক-কলা, ওঁর অভিব্যক্তির ঢং – শৈলী এসব নিয়ে বলা শুরু করলে কোথায় ঠেকবে জানিনা| ওঁকে নিয়ে কখনও আলাদা করে গল্প বলার ইচ্ছে রইল| মেজদি আবার চুটিয়ে ছবি আঁকত – কবিতাও লিখত|  কিটুর প্রচণ্ড আবেগ, প্রচণ্ড চেষ্টা, ক্ষুরধার বুদ্ধি – সে তো দিনে 11 ঘণ্টা 21 দিন তবলা রিয়াজ করবে প্রতিজ্ঞা করে বাজনা শুরু হল| তার পর হাত ফেটে রক্ত – তারপরও ব্যানডেজ বেঁধে প্রতিজ্ঞা পুরো করা| এই তীব্র ইচ্ছে আর চেষ্টা ওই পরিসরেই জন্ম নিয়েছে – প্রকাশিত হয়েছে| আমিও সেতার বগলে কখনও হাজির হয়ে যেতাম আনন্দে ভাসতে|    

মনে পড়ে ঠাকুর ঘরের খাটে বসে দিদিনের গানের রেয়াজ সাথে সমীর মজুমদারের গম্ভীর ঠেকা আর বিলম্বিত একতালের আবর্তনের স্নিগ্ধ অনুভূতি। দরজা পেরিয়ে বারান্দা, সেখানে ইজি চেয়ারে চোখ বন্ধ করে জ্যাঠার গান শোনা।

সেজদির মজা নেওয়াটা অন্যরকম  ছিল। সে অন্যের সৃষ্টিতে মশগুল। মাঝের ঘরের খাটে প্রায়ই সেজদিকে দেখা যেত। কখনও বসে, কখনও শুয়ে, বইয়ের নিচে বই গুঁজে চুপি চুপি উল্টোরথ পড়া, কখনও মলাট-খোলা শরৎচন্দ্র, শঙ্কর, সমরেশ বসু, বা প্রবোধ সান্যাল| কম বয়সের অহেতুক বাঁধনের বেড়া ও বুদ্ধি করে বাঁধন এড়ানোর মজা, বুঝে বা না-বুঝে সেজদির অনুভূতির ব্যাঙ্কে জমা হতেই থাকত|      

         

সুরমণি, চুল, আর জয়ন্তী মল্লার

জনপ্রিয় তারকাদের সাধারণ মানুষের চুল ও সাজের ওপর প্রবল হস্তক্ষেপ চিরকালের| সে তারকা সিনেমা, রাজনীতি, খেলাধুলা, গান-বাজনা বা যে কোনও বিষয়েরই হতে পারে| 1970-এর দশকে ‘ভালো’ বিশেষণটা অনেকটাই পুরাতন ভিত্তিক ছিল| চুল ছোট-ছোট করে কাটা হত, এতে বেশিদিন চলে যেত| কিন্তু রূপালী পর্দায় বড় বড় চুল ওয়ালা নায়কের নাইকাকে ইমপ্রেস করা থেকে শুরু করে ভিলেনকে ঢিসুম-ঢাসুম করে মেরে হারিয়ে দেওয়াতে দর্শক প্রভাবিত হয়ে যেত আর চোখ গিয়ে পড়ত নায়কের চুলে| তার থেকেই চুল কাটার দোকানে শুরু হয়ে গেল উত্তম কাট, দেবানন্দ কাট, ধর্মেন্দ্র কাট, আরও নানা শৈলীর কেশ-কর্তন| যুবসমাজের চুলের দৈর্ঘ ক্রমশ লম্বা হয়ে গেল| প্রবীণেরা এতে ক্ষেপে উঠলেন, নতুনদের বড়-চুল ওয়ালা অসভ্য বলতেও ছাড়লেননা| বোধ হয় বয়স বেড়ে গেলে কম বয়েসিদের ওপর হিংসাও হয়| এ ছাড়া ‘অতীতের সবই সুন্দর’ বা ‘স্মৃতি সততই সুখের’ থেকে অনেকেই বেরুতে পারেন না; নতুনের সাথে তালে তাল মিলিয়ে চলা তো এঁদের স্বপ্নাতীত; নতুনেরা বলে এটা নাকি একটা জেনেটিক ডিফেক্ট| এটা নাকি বাবারও ছিল, দাদুরও ছিল, আর তার বাবারও ছিল|

মনে আছে ‘পাপা’ মানে আমার বাবা আমার গোঁফ রাখার চেষ্টায় ব্যাগড়া দিয়েছিলেন, বললেন গোঁফ নাকি গুন্ডারা রাখে| এখন বুঝতে পারি যে, হয়তো দু-চারজন সমাজ-বিরোধীর ওপর ওনার চোখ গিয়েছিল তাদের মধ্যে কারুর কারুর হয়তো গোঁফ দেখেছিলেন| সে-সময়ের নকশাল আমলে পুলিশের ধড়-পাকড় খুব বেড়ে গিয়েছিল| ওনার হয়তো মনে হয়েছিল অ্যামার গোফে পুলিশ প্রভাবিত হয়ে বিনা দোষে গ্রেপ্তার করে নিতে পারে| সে-সময়ে বড়দের কথা মাথা ঝুঁকিয়ে মেনে নেওয়াই সাধারণ প্রথা ছিল, কেউই খুব একটা ভেরিফিকেশন ভ্যালিডেশন এ যেতনা| আমার তো বহু বছর পর্যন্ত্য বদ্ধমূল ধারণা ছিল বড়রা যা বোঝে-জানে সবই ঠিক| হয়তো বা এই কারণেই বড়রা অনেক সময়েই আমাকে গবেট বলতেন|

1974-75এ আমি প্রথম বম্বেতে বাজাতে যাই| ওখানকার একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্থা নতুনদের বাজানোর সুযোগ দিত আর ভালো গান-বাজনা করে শ্রোতাদের খুশি করতে পারলে পদবী দিতো আর খুব নামী ‘স্বামী হরিদার সঙ্গীত সম্মেলনে’ শীর্ষস্থানীয় গাইয়ে-বাজিয়েদের মাঝে বাজানোর সুযোগ দিত| বম্বে, রায়পুর, জবলপুরে বাজিয়ে কলকাতা ফিরেছি সঙ্গে ‘সুরমণি’ পদবী, বেশ একটু অহংকার অহংকার ভাব, তিনটে অনুষ্ঠানই সুপার-হিট| শ্রোতারা শুধু প্রশংসায় পঞ্চমুখ নয়, যেন দশানন হয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি প্রশংসা করছে|

ওস্তাদজীর কাছে গেলাম, চেহারা দেখেই এক নজরে বুঝে গেলেন ‘ছোড়া বিগড়োচ্ছে’| জিজ্ঞেস করলেন, “বাজনা কেমন হল?” সব শুনে বললেন, “ঠিক আছে”| পরের দিনই দেখলাম বিধি বাম| যন্ত্র নিয়ে সবে ঢুকেছি, আমার দিকে আপদ- মস্তক তাকিয়েই হুঙ্কার, “বেশি পেকেছ?” আমি তো হতভম্ব, হলো কি!! “চুল বাড়িয়ে পন্ডিতজী হবে? যাও চুল কেটে এসো, না হলে এ বাড়িতে ঢুকবে না|” রবিশংকরজী চুল বড় রাখতেন, আমিও ফাঁকতালে হিরো হবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বুড়োর চোখ এড়াতে পারলে তবে না–| অতএব, মনের দুঃখে গুটি গুটি পায়ে যাদবপুর বাজারের কাছে নভেলটি সেলুনে গিয়ে চুল কাটুয়ে আসলাম| তারপর শেখা  শুরু হল, “বাজাও” — জয়ন্তী মল্লার!  

যুক্তি-তক্ক-গপ্প ও পিনাকেশদা

অধ্যাপক পিনাকেশ সরকারকে সারা জীবন দাদা-ই বলে-ডেকে এসেছি। পাড়াতে ওই 24 ইঞ্চি ঘেরের ঢিলে পাজামা সাথে কখনও  শার্ট বা পাঞ্জাবি, আর বাইরে খুব যত্নে কোঁচানো ধুতি সাথে বোতাম হাতার পাঞ্জাবি – একেবারে কিলার চেহারা| পিনাকেশদার সাহিত্যিক, কবি, ও বিদগ্ধ চিন্তক বৃত্তে একটা জাঁদরেল উপস্থিতি ছিল। 1960-র দশকে বাংলায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাদার বিএ অনার্স আর এমএ দুটোতেই প্রথম হবার নম্বর একটা বিরল ঘটনা ছিল। ওঁর সহকর্মী শঙ্খদার সাথে অদ্ভুত বন্ধুত্ব-ভ্রাতিত্ব দূর থেকে চোখ ভরে দেখেছি| শঙ্খদা—কবি শঙ্খ ঘোষ—শুধু কবি নন, বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক বিবেকের অন্যতম মুখ ছিলেন। দাদা জানে কিনা জানিনা, অনেকেই পেছনে পেছনে ওঁদের জুটিকে ‘পিনাকেশ-বিনাকেশ’ বলত। বয়সের সাথে শঙ্খদা-র চুল অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এসব সাহিত্যর কথা এখন একটু তোলা থাক| শিশিরদার কাছে শুনেছি ওঁর নাকি কলকাতার এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবার কথা ছিল কিন্তু নানা কারণে ওটা আর হয়নি| এতে খারাপ না হয়ে হয়ত ভালোই হয়েছে, সে সময়ের অস্থির কলকাতায় হয়তো শান্তির থেকে অশান্তি পাল্লা ভারী হয়ে উঠত|

আমার ধারণা আমার মনে পিনাকেশদার দাদাবস্থানের গোড়াপত্তন মনে হয় 1973-74 নাগাদ| ওস্তাদজির বাড়ির পরে একটা বাড়ি ছেড়ে যাদবপুরের কালীবাড়ি লেন-এ বাঁ-দিকে একটা গলি চলে গিয়েছে। সেই গলি দিয়ে দু-চার পা হাঁটলেই দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে খুব-সরু আরেকটা রাস্তা  ডান দিকে ঢুকে গেছে। ওখান দিয়ে দু-পা গেলেই বাড়িতে ঢোকার দরজা, লাল সিমেন্টের তিনটে  সিড়ি পেরিয়ে ডান দিকে পিনাকেশদার ফ্ল্যাটের দরজা ও কলিংবেল। বুধবার ওস্তাদজির কাছে শেখার পরেই সকাল সাড়ে নটায় বৌদি ও দাদার কানে ডিং-ডং বেজে উঠত। বেশিরভাগ সময়েই বৌদি দরজা খুলত, কখনও কখনও দাদা। প্রায়ই সাথে সাথে দাদার নাগাল পেতাম না, অন্য ঘরে কাজ করতেন, তারপর এ ঘরে এসে, “বল, সঞ্জয়—”| আধ-ঘণ্টা নানা বিষয়ে যুক্তি-তর্ক-গপ্প; ছুটির দিন হলে আধ-ঘণ্টা বেড়ে হয়তো বা তিন ঘণ্টা। সময়টা যে কি করে ফুরুৎ করে শেষ হয়ে যেত – টেরই পেতাম না| প্রায়ই আমাদের বাদানুবাদ রাধিকা মোহন থেকে বিলায়েত খান থেকে হরি প্রসাদ চৌরসিয়া থেকে নিখিল ব্যানার্জি থেকে সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে দেশে পত্রিকায় সমালোচনা, স্টেটসম্যান, যত্র তত্র অনায়াসে বিচরণ করত। এখানে একটা জরুরি কথা বলে নেওয়া দরকার, দাদা আর ওস্তাদজির মধ্যে বয়সের ফারাক অনেকটা থাকলেও প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। দাদাও ওস্তাদজিকে বাঁধনছাড়া শ্রদ্ধা করতেন।  

পিনাকেশদার বিশেষ অবস্থান আমার বেড়ে ওঠা, বোঝার শৈলী ও অভিব্যক্তিতে নানা দিক দিয়ে প্রভাব ফেলেছে|

এক

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। তখন নীলাক্ষদা মানে নীলাক্ষ গুপ্ত কলকাতার বুকে একজন ডাকসাইটে সংগীত সমালোচক, আনন্দবাজার পত্রিকা, সানডে, দেশ সাপ্তাহিক সবেতেই উনি বড় বড় নামী ওস্তাদদের ভুল ধরাচ্ছেন, এমন কি রবিশঙ্করজি ও ছাড়া পাচ্ছেন না। উনি একেবারে সরগম দিয়ে কোথায় কথায় রাগচ্যুতি ঘটেছে সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে মালুম করিয়ে দিচ্ছেন। বাবলু আমার বন্ধু। ও বলল, কি রে, নীলাক্ষ গুপ্তর কলম বন্ধ করাতে পারবি? ওর ক’দিন পরেই সি-এল-টির  অবন মঞ্চে আমার বাজনা ছিল। ভাবলাম কি করে নীলাক্ষদার রাগাস্ত্র থেকে বাঁচা যায়। ভাবলাম এমন রাগ যদি নেওয়া যায় যেটা ওনার জানা নেই তাহলেই ফসকে যাওয়া সহজ হবে| গুরুর নাম নিয়ে ঠিক করলাম ছায়া বেহাগ বাজাব, তার পরই শুরু করলাম দিন-রাত রেয়াজ| ভোরবেলাও ছায়া বেহাগ, দুপুরেও ছায়া বেহাগ আবার রাত দুটোতেও ছায়া বেহাগ| পর্দা উঠতেই দেখতে পেলাম বাংলার বাঘেরা সব বসে আছেন, নিলাক্ষদাও তৃতীয় সারিতে ভুল ধরার জন্য সজাগ অবস্থান করছেন| উস্তাদ আসলাম খানের তবলার সাথে ছায়া বেহাগ বেশ জমে গেল| বুদ্ধদা, মানে, পন্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কেন জানি শেষের সারিতে গিয়ে বসেছিলেন| ওনার জোরে জোরে তারিফ সবার কানেই পৌছুচ্ছিল| সামনের সারিতে ওস্তাদজী ছিলেন; বেরুনোর সময় লাঠি উঁচিয়ে বললেন, “সব শুনে নিয়েছি, বাইরে এসো — হবে—“  আপনারা বুঝলেন তো, বাইরে বেরুলেই উত্তম মধ্যম| অনুষ্ঠান হয়ে গেল| আমি তো ওস্তাদজির বাড়ির সামনের রাস্তাই ছেড়ে দিলাম, দেখতে পেলেই ঝাড় খাব| কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে পিনাকেশদার বাড়ি যেতাম আর ওখান থেকেই খবর পেতাম, “তুমি সব ভুল-ভাল বাজিয়েছ; রাধুদা খুব খেপে গ্যাছেন| যাও, গিয়ে দেখা কর|” আমি বললাম, “পাগল? মাথা ঠান্ডা হোক তারপর দেখা যাবে| সবথেকে বড় কথা, উনি যা শিখিয়েছেন তাই বাজিয়েছি| ভুল হলে তার দায়িত্ব কি আমার?” এসব নিয়ে দাদা-ভাইয়ের মহা বাক-বিতণ্ডা, বৌদি মাঝে এসে বললেন, “অনেক হয়েছে, এবার থামো|” তিনদিন পরে স্টেটসম্যান এ বুদ্ধদার লেখা সমালোচনা বেরুল| উনি লিখলেন যা বাংলা করলে দাঁড়ায়, সঞ্জয় যেমন ভাবে ছায়া বেহাগের স্বর-বিন্যাস করেছে এতে অসাধারণ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে আর এভাবেই হওয়া উচিত| আমি তো ওই লেখা পড়ে বুক উঁচিয়ে পিনাকেশদার বাড়ি গেলাম| এর মধ্যে ওস্তাদজী পড়ে গেলেন বিপদে; এক ছাত্র রাগটা অন্যভাবে বাজিয়েছে আর অন্য ছাত্র গণমাধ্যমে তার প্রশংসা করছে| পরে দাদার কাছে শুনেছিলাম যে ওস্তাদজি বলেছেন, “আমিই বোধ হয় ওদের ঠিক করে শেখাতে পারিনি|” এ নিয়ে ওস্তাদজী আর কিছু বলেন নি| আর, নীলাক্ষদার দেশের সমালোচনাতে রাগের শুদ্ধতা নিয়ে কোন কথা ছিলনা|

           

দাদুর ডাইকোটমি

English Translation. Hindi Translation

আমাদের ছোট্ট দাদু বড় হতে হতে 145 বছরের হয়ে গেল|পুরনো সামাজিকতায় বেঁধে লিখলে আপনি সম্বোধনেই লেখার কথা| কিন্তু, আমি তো সৃষ্ঠিছাড়া| কোনোদিনই দাদুকে আপনি বলে ডাকিনি, তাই আজও ডাকব না| আপনি আজ্ঞে এসব আমার পাপা, জ্যাঠা, পিসিরা ব্যবহার করত, আমরা নাতি নাতনি, প্রোনাতি, প্রোনাতনিরা ওসব পরনো পোষাকি রং-ঢং এ বিশ্বাসী ছিলাম না| আমরা সব্বাই দাদুকে খুব ভালবাসতাম আর মনের আনন্দে তুমি বলতাম, দাদুও আমাদের কোনদিন আপত্তি জানায়নি| দাদু যদি ওই গম্ভীর গলায় “না” বলে উঠত তাহলে কার কি জো ছিল যে অন্য কিছু হয়| লোকে বলে ওঁর দাপটে নাকি বাঘে গরুতে একই ঘাটে জল খেত|

দাদুর যে চেহারাটা আমাদের কিছু মানুষের মনে এখনও গেঁথে আছে তাতে লম্বা সাদা দাড়ি, গেরুয়া ধুতি-চাদর, একটা বেতের লাঠি, একটা চরখা, একটা কাঠের ডেস্ক, দাগ টানা খাতা, দোয়াত-কলম, একটা চিনে মাটির কাঁধ-উঁচু বড় খাবারের প্লেইট, একটা বড় খাবার চামচ, কাটা, একটা ইজি চেয়ার, খিচুড়ি-তেতো-তরকারি-দই সব একসাথে মিলিয়ে মাধুকরী, সব মিলিয়ে বহু কনট্রাস্ট, বহু রং – একটার সাথে অন্যটা মেলানো খুব মুশকিল|

আমি যখন দশ বছর ছাড়িয়ে এগারোতে এলাম তখন থেকেকে আর দাদুকে দেখতে পাইনা, বাইরের দিকে না তাকিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখতে হয়| আমি তো দাদুকে ঝক-ঝকে দেখতে পাই| আমার চোখে ফরসা, টাক মাথা, লম্বা সাদা দাড়ি, ধুতি-ফতুয়া-চাদর এটা দাদুকে দেখা চেহারা, অন্য-রকম একটা দাদু আছে সেটা শোনা আর মনের সাজে সাজিয়ে নেওয়া|

দাদু তখন আমাদের সাথে বেহালায় আমাদের ভাড়াবাড়ীতে| দাদুর একটা আলাদা ছোট ঘর ছিল, আমার বাকিরা অন্য একটা বড় ঘরে থাকতাম| একদিন দাদু বলল, “চলো সোনাভাই, আমি আমার এক পুরনো ছাত্রের দেখা পেয়েছি| চলো, তোমাকে একদিন আমার ছাত্রর কাছে নিয়ে যাব|” আমি তো খুব এক্সসাইটেড হয়ে পড়লাম|শেষে একদিন বিকেলবেলা দাদুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম| আমরা তখন 36বি বেচারাম চ্যাটার্জী রোডের ভাড়াবাড়িতে  থাকি, যেটা পরে নম্বর বদলে 28 নম্বর হয়ে গিয়েছিল|

সে যা হোক, আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সরশুনার দিকে হাঁটতে থাকলাম| অবশেষে দাদুর সেই ছাত্রের ডেরা আসল| দেখলাম সেটা একটা বুড়োদের আসর| ওদের মধ্যে দাদুকে এক বড় দাড়ি ওয়ালা বুড়ো, পরে বুঝেছিলাম ও দাদুর স্টাইল এ দাড়ি বাড়ানোর চেষ্টা করছিল, উঠে আসলো| আরে, আসুন আসুন| তারপরে সশ্রদ্ধায় প্রণাম| দাদু অল্পসময় বসলেন আর তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন| আসতে আসতে দাদু বলল, তার এই ছাত্রটি ওঁর কলেজে পড়ত| আপনারা  তো জানেন, দাদু ময়নামতী সার্ভে কলেজ এর প্রিন্সিপাল ছিলেন| উনি প্রিন্সিপাল ছিলেন এটা একটা প্রচলিত খবর, অনেকেই জানেন, কিন্তু আমি কখনও ওর বিপক্ষের লন্ডন থেকে আসা ইনকোয়ারি অফিসারের দাদুকে সোজা প্রশ্ন “Are you a wrangler?” নিয়ে আসর জমানোর ইচ্ছে রইল.

টিপ্পনী: At the University of Cambridge in England, a “Wrangler” is a student who gains first-class honours in the Mathematical Tripos competition. 

Click to know more: https://en.wikipedia.org/wiki/Wrangler_(University_of_Cambridge)            

Yesterday was dadu’s 146th Birthday. [b. Ramanavami 1880, d. 14 June 1985]. I designed. a Birthday card for him. Here it is:

আমি এই ভিডিওটা অনেককে.পাঠিছিলাম. ছোড়দির কাছ থেকে প্রায় সাথে সাথেই উত্তর পেলাম । ও লিখলো : “অসাধারণ অপূর্ব অদ্ভূত সুন্দর– করলি কি করে???!!!!”

আমি দুষ্টুমি করে উত্তর দিলাম…

এটা খুউবই সোজা। এটা তুইও ছোটবেলায় করেছিস, একে আমরা বলতাম প্ল্যানচেট|

দাদুকে ডাকলাম, বললাম সাহেবী পোশাকে নেকটাই পড়ে চলে এসো| তারপর “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ”, কিছু বেলুন উড়িয়ে ভিডিও করতে শুরু করে দিলাম| জানিস তো দাদু কিছুতেই বেশিক্ষণ থাকল না — চলে গেল| ভাগ্যিস একটু ভিডিও করে রেখেছিলাম, দ্যাখ, তুইও দেখতে পেলি|  

বিশ্বাস করলি না তো? জানি করবি না| কথায় বলে, “বিশ্বাসে মিলায় দাদু, তর্কে বহুদূর|”   

কলকাতা | 28/03/2026

English Translation

Dadu’s Dichotomy

Our little “Dadu” (grandfather), as time passed, turned 145 years old. According to old social customs, one is supposed to address elders formally while writing. But I’ve always been a bit unconventional. I never addressed Dadu formally, and I won’t start today either. That kind of formal “you” was used by my father, uncles, and aunts. We—his grandchildren and great-grandchildren—never really believed in those old-fashioned formalities.

We all loved Dadu dearly and happily addressed him informally as “you.” And Dadu never objected. If he had ever said “no” in that deep, serious voice of his, no one would have dared to go against it! People used to say that such was his authority that even a tiger and a cow could drink water from the same ghat under his influence.

The image of Dadu that is still etched in some of our minds includes a long white beard, saffron dhoti and shawl, a cane stick, a spinning wheel, a wooden desk, lined notebooks, ink and pen, a large high-edged porcelain plate, a big serving spoon, a fork, an easy chair, and meals of khichuri, bitter vegetables, curry, and curd all mixed together like “madhukari.” Altogether, he was a striking blend of contrasts and colors—hard to reconcile into a single picture.

When I crossed ten and turned eleven, I could no longer see Dadu outwardly; I had to look inward to find him. But in my mind’s eye, I see him clearly—fair-skinned, bald-headed, with a long white beard, dressed in dhoti, vest, and shawl. That is the Dadu I have seen. The other version of him is something I’ve only heard about and imagined in my own way.

Back then, Dadu lived with us in our rented house in Behala. He had a small separate room, while the rest of us stayed in a bigger one. One day, Dadu said, “Come, Sonabhai, I’ve found one of my old students. Let me take you to meet him.” I was very excited. Finally, one afternoon, holding Dadu’s hand, I set out with him. We were then living at 36B Becharam Chatterjee Road, which was later renumbered as 28.

Anyway, we walked from our house towards Sarsuna. At last, we reached the place where that student lived. It turned out to be a gathering of elderly men. Among them, one old man with a large beard—later I realized he was trying to imitate Dadu’s style—came forward warmly to receive him. “Ah, please come, please come!” he said, and then bowed respectfully.

Dadu sat for a short while, and then we started walking back home. On the way, Dadu told me that this man had been his student in college. As you know, Dadu was the principal of Moynamoti Survey College. Many people are aware of this fact. But I’ve always been curious to recreate that moment when an inquiry officer from London asked him directly, “Are you a wrangler?”

Note: At the University of Cambridge in England, a “Wrangler” is a student who earns first-class honours in the Mathematical Tripos.

Yesterday was Dadu’s 146th birthday.
(Born on Ramanavami, 1880 – Died on 14 June 1985.)
I designed a birthday card. Here it is.

Hindi Translation

हमारे छोटे से दादू उम्र बढ़ते-बढ़ते 145 साल के हो गए। पुरानी सामाजिक परंपराओं के अनुसार लिखते समय उन्हें औपचारिक “आप” कहकर संबोधित करना चाहिए। लेकिन मैं तो हमेशा से थोड़ा अलग रहा हूँ। मैंने कभी भी दादू को “आप” नहीं कहा, इसलिए आज भी नहीं कहूँगा। “आप-आज्ञा” जैसी बातें मेरे पापा, चाचा और बुआ लोग इस्तेमाल करते थे; हम—नाती, नातिन, परनाती, परनातिन—इन पुराने औपचारिक ढंगों में विश्वास नहीं रखते थे।

हम सब दादू को बहुत प्यार करते थे और दिल से उन्हें “तुम” कहकर बुलाते थे। दादू ने भी कभी कोई आपत्ति नहीं की। अगर वे अपनी उस गंभीर आवाज़ में “ना” कह देते, तो किसी की क्या मजाल थी कि कोई और कुछ करता! लोग कहते हैं कि उनके रौब में तो बाघ और गाय भी एक ही घाट पर पानी पीते थे।

दादू की जो छवि आज भी हममें से कुछ लोगों के मन में बसी है, उसमें एक लंबी सफेद दाढ़ी, गेरुआ धोती-चादर, एक बेंत की लाठी, एक चरखा, एक लकड़ी की मेज़, लाइन वाली कॉपियाँ, दवात-कलम, एक ऊँची किनारी वाली बड़ी चीनी मिट्टी की थाली, एक बड़ा चम्मच, कांटा, एक ईज़ी चेयर, और खिचड़ी, कड़वी सब्ज़ी, तरकारी, दही सबको मिलाकर बना “माधुकरी”—सब कुछ शामिल है। कुल मिलाकर कई तरह के विरोधाभास, कई रंग—जिन्हें एक साथ मिलाना आसान नहीं।

जब मैं दस साल पार करके ग्यारह का हुआ, तब से मैं दादू को बाहर से देख नहीं पाता; उन्हें देखने के लिए भीतर झाँकना पड़ता है। लेकिन मेरी आँखों में दादू साफ-साफ दिखाई देते हैं—गोरा रंग, गंजा सिर, लंबी सफेद दाढ़ी, धोती-फतुआ-चादर पहने हुए। यही वह रूप है जिसमें मैंने दादू को देखा है। दादू का एक और रूप है, जिसके बारे में केवल सुना है और मन में कल्पना करके सजाया है।

उस समय दादू हमारे साथ बेहाला में हमारे किराए के घर में रहते थे। उनका एक छोटा अलग कमरा था, और हम बाकी लोग एक बड़े कमरे में रहते थे। एक दिन दादू ने कहा, “चलो सोनाभाई, मुझे मेरा एक पुराना छात्र मिला है। चलो, तुम्हें एक दिन उससे मिलवाता हूँ।” मैं तो बहुत उत्साहित हो गया। आखिर एक दिन शाम को दादू का हाथ पकड़कर निकल पड़ा। तब हम 36B बेचाराम चटर्जी रोड के किराए के घर में रहते थे, जिसका नंबर बाद में बदलकर 28 हो गया।

खैर, हम घर से निकलकर सरशुना की ओर पैदल चलने लगे। आखिरकार दादू के उस छात्र का ठिकाना आ गया। देखा, वह बूढ़े लोगों की एक महफ़िल थी। उनमें से एक बड़ी दाढ़ी वाला बूढ़ा—बाद में समझ आया कि वह दादू की शैली में दाढ़ी बढ़ाने की कोशिश कर रहा था—उठकर आया और बोला, “अरे, आइए, आइए!” फिर उसने श्रद्धा से प्रणाम किया।

दादू थोड़ी देर बैठे, फिर हम घर की ओर लौटने लगे। रास्ते में दादू ने बताया कि यह उनका छात्र उनके कॉलेज में पढ़ता था। आप तो जानते ही हैं, दादू मयनामती सर्वे कॉलेज के प्रिंसिपल थे। यह बात काफ़ी प्रचलित है और बहुत लोग जानते हैं। लेकिन मेरे मन में हमेशा यह इच्छा रही कि उस लंदन से आए इनक्वायरी ऑफिसर और दादू के बीच हुई सीधी बातचीत—“Are you a wrangler?”—को लेकर एक सभा जमाऊँ।

टिप्पणी: इंग्लैंड के कैम्ब्रिज विश्वविद्यालय में “Wrangler” उस छात्र को कहा जाता है जो Mathematical Tripos परीक्षा में प्रथम श्रेणी में उत्तीर्ण होता है।
और जानने के लिए: https://en.wikipedia.org/wiki/Wrangler_(University_of_Cambridge)

यह तो बहुत ही आसान है। यह तुमने भी बचपन में किया है—इसे हम “प्लांचेट” कहते थे।

मैंने दादू को बुलाया और कहा—साहबी कपड़े पहनकर, नेकटाई लगाकर आओ। फिर “हैप्पी बर्थडे टू यू” गाया, कुछ गुब्बारे उड़ाए और वीडियो बनाना शुरू कर दिया। तुम तो जानते ही हो, दादू ज़्यादा देर रुके नहीं—चले गए। अच्छा हुआ कि थोड़ा वीडियो बना लिया था—देखो, तुम भी देख पाए।

यकीन नहीं हुआ न? मुझे पता था, नहीं होगा। कहा भी जाता है—
“विश्वास में दादू मिलते हैं, तर्क में बहुत दूर चले जाते हैं।”

বগলা প্রসন্ন, স্যান্ডহার্স্ট, ও চার্চিল

English translation Hindi Translation

কিছু শোনা গল্প

গত-রাত্রে আবিষ্কার করলাম যে আমি শুনে শুনে অনেক কিছু জানি, কিন্তু এ খবরটা আমার কাছেই ছিলনা। গতকাল ছেলে আর তার বৌ আমাকে বগলদাবা করে দাদা-বৌদির সল্টলেকের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানেই এই অবাক-জ্ঞান প্রকট হ’ল। কেন কি ব্যাপার এসব বলতে গেলে পুরো মজাটাই চটকে যাবে। কিন্তু যে আইডিয়াটা এলো তা হচ্ছে “শোনা গল্প” এই নামে একটা সিরিজ শুরু করতে হবে। সিরিজের প্রথম গল্প “বগলা প্রসন্ন, স্যান্ডহার্স্ট, ও চার্চিল”।

[সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মার্চ 22, 2026]

বগলা প্রসন্ন, স্যান্ডহার্স্ট, ও চার্চিল

সেটা ছিল 1923, বগলা প্রসন্নর বয়স তখন বছর পনেরো হবে। ডানহাতে ভারী রোলার আর বা-কাখে বছর তিনেকের ছোট ভাই খোকনকে নিয়ে টিলার ওপরে বাড়িতে পৌঁছন বগলার খেলার মধ্যেই পড়ত। সুঠাম শরীর আর শক্তি দেখে অ্যাশ-পাশের মানুষ প্রশংসার চোখে তাকিয়ে থাকত। গল্পের সূত্রপাত এখান থেকেই।

সেদিন রবিবার, রাজেন্দ্রলালের বাড়িতে সাজ-সাজ রব, কেউ টেবিল সাজাচ্ছে তো কেউ চেয়ার মুছছে, সব ঝকঝকে দেখাতে হবে। নতুন চিনামাটির প্লেট, ছুড়ি, কাঁটা, চামচ সব থরে থরে সাজানো হচ্ছে, তাড়া-হুড়োতে মাঝে মাঝেই বাসনে-বাসনে ঠকাঠুকির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সকাল 11-টা নাগাদ খবর এলো ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পৌঁছে গেছেন। হঠাৎ করেই পুরো বাড়ী শান্ত হয়ে গেল। কোট প্যান্ট টাই বুট পরা টক টকে গোরা সাহেব চার্লস জিওফ্রে বাকল্যান্ড স্টিভেনস  তার গাউন পরা বৌকে নিয়ে গট গট করে হেঁটে ওপরে উঠে এলেন। রাজেন্দ্রলাল তখন এগিয়ে এসে “গুড মর্নিং মিস্টার স্টিভেনস, হ্যালো ম্যাডাম গুড মর্নিং” করে অভ্যর্থনা জানালেন। আসুন আসুন করে অতিথিদের বসান হল, সামনে বড় টেবিল তাতে যত্নে সাজানো বাগান থেকে সদ্য তুলে আনা থোকা থোকা ফুল।

রাজেন্দ্রলাল তাঁর বড়ছেলেকে ডাকলেন, “খোকা, এদিকে আয়।“ বালক বগলা প্রসন্ন মাথা উঁচু পিঠ সোজা করে ঘরে ঢুকল। ব্যাপারটা সাহেবের কিছুটা অন্যরকম লাগল। সাহেব ভাবলেন “Indian kids are rarely this confident!” বগলা প্রসন্ন এগিয়ে এসে সাহেবের সাথে হাত মেলালেন। ১৫ বছরের বগলা আর ৪৩ বছরের স্টিভেনস। মিলিটারি ট্রেইন্ড সাহেবের বজ্রমুষ্টি বগলার হাতে পড়ল। বগলা বুঝল যে সাহেব হাত শক্ত করছে, সেও হাতের শক্তি বাড়াতে শুরু করল। সাহেব শক্তি বাড়াচ্ছে তো বগলাও বাড়াচ্ছে। ৪৩বছরের স্টিভেনস আর  ১৫র বগলার এই ছোট্ট শক্তি যুদ্ধে সাহেব বুঝলেন যে এই বাচ্চার প্রতিভা আছে। স্টিভেনস ততক্ষণে ইমপ্রেসড হয়ে গ্যাছেন, ওঁর মিলিটারি ইনস্টিংট কাজ করতে শুরু করেছে। বগলা ঘর থেকে চলে যাবার পর সাহেব মুখ খুললেন। বললেন, “Mr. Banerjee, let me tell you something. I think, your son Bagala will do good if he goes through military training. What do you think?  I shall be glad to check out the possibilities.” রাজেন্দ্রলাল বললেন, “Certainly, Sir, whatever you think good. I shall be very glad.”  

এর পর স্টিভেনস সাহেব ইংল্যান্ডে ওর এক বন্ধুকে চিঠি লিখে পুরো ব্যাপারটা জানান। বন্ধু চার্চিল তখন সেক্রেটারি অফ স্টেট অফ ওয়ার। চার্চিল, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন স্যার উইনস্টন চার্চিল যিনি পরে ব্রিটিশ প্রিমিয়ারে হয়েছিলেন। উনি স্যান্ডহার্স্টে, মানে রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টএ বগলা প্রসন্নের ভর্তির জন্য সুপারিশ করেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি ভারত-পাকিস্তানের 1965-র যুদ্ধের দুই-পক্ষের সেনা-প্রমুখ জেনারেল জে এন চৌধুরী ও জেনারেল আয়ুব খান দুজনেই 1920’র দশকে একই সাথে  স্যান্ডহার্স্টে প্রশিক্ষিত হন।

স্যান্ডহার্স্ট থেকে বগলা প্রসন্নের ভর্তির চিঠি ছাড়া হয়, সে চিঠি যখন কুমিল্লার ময়নামতী পৌঁছয় তখন বগলা অসুস্থ, আর তার কিছুদিন পর উনি টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওর স্যান্ডহার্স্টে ভর্তি হয়ে নিজেকে প্রমাণিত করা আর হয়ে উঠলোনা। এই ধাক্কাটা খুব ভারী পড়ল। অনেকেই মনে করেন, এই ঘটনা সম্পূর্ণ পরিবারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে সবলে নাড়িয়ে দিয়েছিল।      

English Translation

Stories Heard in Passing

Last night I discovered something about myself—that I know many things simply by listening, yet I was unaware of this fact myself. Yesterday, my son and his wife practically dragged me off to my elder brother and sister-in-law’s house in Salt Lake, and it was there that this surprising realization surfaced.

If I begin to explain why and how, the charm of the story will be lost. But the idea that emerged is this: I must start a series titled “Stories Heard in Passing.”

The first story in this series: “Bagala Prasanna, Sandhurst, and Churchill.”

[Sanjay Bandopadhyay, March 22, 2026]

Bagala Prasanna, Sandhurst, and Churchill

It was the year 1923. Bagala Prasanna was about fifteen years old. Carrying a heavy roller in his right hand and his three-years-younger brother Khokon tucked under his left arm, climbing up to their house on the hill was part of Bagala’s play. His well-built physique and strength drew admiring glances from people around. The story begins from here.

That day was a Sunday. At Rajendralal’s house there was a flurry of preparation—someone arranging the table, someone polishing chairs. Everything had to look spotless. New porcelain plates, knives, forks, and spoons were being laid out in neat rows. In the rush, the occasional clinking of utensils could be heard.

Around 11 in the morning, news arrived: the District Magistrate Sahib had reached. Suddenly, the entire house fell silent. Dressed in coat, pants, tie, and boots, the fair-skinned Englishman Charles Geoffrey Buckland Stevens walked in briskly with his gown-clad wife and went upstairs. Rajendralal stepped forward and greeted them warmly,
“Good morning, Mr. Stevens. Hello, Madam, good morning.”

The guests were seated. In front of them was a large table, carefully decorated with freshly picked clusters of flowers from the garden.

Rajendralal called out to his elder son,
“Khoka, come here.”

The young Bagala Prasanna entered the room, head held high, back straight. Something about him struck the Sahib as unusual. He thought to himself, “Indian kids are rarely this confident!”

Bagala stepped forward and shook hands with him. Fifteen-year-old Bagala and forty-three-year-old Stevens. The military-trained Sahib’s iron grip met Bagala’s hand. Bagala realized the Sahib was tightening his grip, and he began to increase his own strength in response. As Stevens tightened, Bagala matched him. In this brief contest of strength between a 43-year-old man and a 15-year-old boy, the Sahib quickly recognized the boy’s potential.

Impressed, Stevens’ military instinct was awakened. After Bagala left the room, he spoke:
“Mr. Banerjee, let me tell you something. I think your son Bagala will do well if he goes through military training. What do you think? I shall be glad to check out the possibilities.”

Rajendralal replied,
“Certainly, Sir. Whatever you think is good, I shall be very glad.”

After this, Stevens wrote to a friend of his in England explaining the entire matter. That friend was Churchill, who at the time was the Secretary of State for War. Yes, Sir Winston Churchill, who later became the British Prime Minister. He recommended Bagala Prasanna for admission to Sandhurst—the Royal Military Academy.

As a side note, it is worth mentioning that the commanding generals of both sides in the 1965 India–Pakistan war—General J. N. Chaudhuri and General Ayub Khan—were both trained at Sandhurst during the 1920s.

An admission letter for Bagala Prasanna was issued from Sandhurst. But by the time the letter reached Mainamati in Comilla, Bagala had fallen ill. Soon after, he succumbed to typhoid and passed away.

His journey to Sandhurst and the possibility of proving himself never came to fruition.

The shock of this loss was immense. Many believe that this single event deeply shook the entire family—both in its present and its future.          

Hindi Translation

सुनी-सुनाई कहानियाँ

कल रात मैंने अपने बारे में एक नई बात खोजी—कि मैं बहुत-सी बातें केवल सुनकर जानता हूँ, पर यह बात मुझे खुद ही पता नहीं थी। कल मेरा बेटा और उसकी पत्नी मुझे लगभग पकड़कर सॉल्ट लेक में मेरे बड़े भाई और भाभी के घर ले गए थे, और वहीं यह आश्चर्यजनक अनुभूति सामने आई।

क्यों और कैसे—यह बताने लगूँ तो कहानी का सारा मज़ा चला जाएगा। लेकिन एक विचार ज़रूर आया—“सुनी-सुनाई कहानियाँ” नाम से एक श्रृंखला शुरू करनी चाहिए।

इस श्रृंखला की पहली कहानी:
बगला प्रसन्न, सैंडहर्स्ट और चर्चिल”

[संजय बंद्योपाध्याय, 22 मार्च 2026]

बगला प्रसन्न, सैंडहर्स्ट और चर्चिल

वह वर्ष 1923 था। बगला प्रसन्न की उम्र तब लगभग पंद्रह वर्ष रही होगी। दाहिने हाथ में भारी रोलर और बाईं बाँह में अपने तीन साल छोटे भाई खोकोन को दबाए हुए, टीले पर बने घर तक चढ़ जाना बगला के लिए खेल जैसा था। उसका सुदृढ़ शरीर और ताकत देखकर आसपास के लोग प्रशंसा भरी नज़रों से देखते थे। कहानी की शुरुआत यहीं से होती है।

उस दिन रविवार था। राजेंद्रलाल के घर में खूब तैयारी चल रही थी—कोई मेज़ सजा रहा था, तो कोई कुर्सियाँ साफ कर रहा था। सब कुछ चमकदार दिखना चाहिए। नई चीनी मिट्टी की प्लेटें, छुरी, कांटे और चम्मच करीने से सजाए जा रहे थे। भाग-दौड़ के बीच बर्तनों की खनखनाहट भी सुनाई दे रही थी।

करीब सुबह 11 बजे खबर आई कि डिस्ट्रिक्ट मैजिस्ट्रेट साहब पहुँच चुके हैं। अचानक पूरे घर में सन्नाटा छा गया। कोट-पैंट, टाई और बूट पहने गोरे साहब चार्ल्स जियोफ्रे बकलैंड स्टीवन्स अपनी गाउन पहने पत्नी के साथ तेज़ी से चलते हुए ऊपर आए। राजेंद्रलाल आगे बढ़े और उनका स्वागत किया—
“गुड मॉर्निंग, मिस्टर स्टीवन्स। हैलो मैडम, गुड मॉर्निंग।”

मेहमानों को बैठाया गया। सामने बड़ी मेज़ थी, जिस पर बगीचे से अभी-अभी तोड़े गए फूलों के गुच्छे सलीके से सजाए गए थे।

राजेंद्रलाल ने अपने बड़े बेटे को बुलाया—
“खोका, इधर आओ।”

बालक बगला प्रसन्न सिर ऊँचा और पीठ सीधी करके कमरे में आया। यह बात साहब को कुछ अलग लगी। उन्होंने सोचा—भारतीय बच्चे इतने आत्मविश्वासी कम ही होते हैं!”

बगला आगे बढ़ा और साहब से हाथ मिलाया। पंद्रह साल का बगला और तैंतालीस साल के स्टीवन्स। सैन्य-प्रशिक्षित साहब की मजबूत पकड़ बगला के हाथ पर पड़ी। बगला समझ गया कि साहब अपनी पकड़ कस रहे हैं, तो उसने भी अपनी ताकत बढ़ानी शुरू की। जैसे-जैसे स्टीवन्स अपनी शक्ति बढ़ाते गए, बगला भी वैसा ही करता गया। इस छोटे-से शक्ति-परीक्षण में साहब ने समझ लिया कि इस लड़के में असाधारण क्षमता है।

स्टीवन्स प्रभावित हो चुके थे, उनका सैन्य अनुभव काम करने लगा। बगला के कमरे से बाहर जाते ही उन्होंने कहा—
“मिस्टर बनर्जी, मैं आपको एक बात बताना चाहता हूँ। मुझे लगता है कि आपका बेटा बगला सैन्य प्रशिक्षण के लिए बहुत उपयुक्त रहेगा। आप क्या सोचते हैं? मैं इस दिशा में संभावनाएँ देखने के लिए तैयार हूँ।”

राजेंद्रलाल ने उत्तर दिया—
“निश्चित रूप से, सर। आप जो उचित समझें, मुझे बहुत खुशी होगी।”

इसके बाद स्टीवन्स ने इंग्लैंड में अपने एक मित्र को पत्र लिखकर पूरी बात बताई। वह मित्र उस समय युद्ध विभाग के सचिव थे—चर्चिल। जी हाँ, वही सर विंस्टन चर्चिल, जो बाद में ब्रिटेन के प्रधानमंत्री बने। उन्होंने बगला प्रसन्न के लिए सैंडहर्स्ट—रॉयल मिलिट्री अकादमी—में प्रवेश की सिफारिश की।

यह उल्लेखनीय है कि 1965 के भारत-पाकिस्तान युद्ध के दोनों पक्षों के सेना प्रमुख—जनरल जे. एन. चौधुरी और जनरल अयूब खान—दोनों ने 1920 के दशक में सैंडहर्स्ट में प्रशिक्षण प्राप्त किया था।

सैंडहर्स्ट से बगला प्रसन्न के नाम प्रवेश-पत्र भेजा गया। लेकिन जब वह पत्र कुमिल्ला के मयनामती पहुँचा, तब तक बगला बीमार पड़ चुका था। कुछ ही समय बाद वह टाइफॉयड से ग्रस्त होकर चल बसे।

सैंडहर्स्ट जाकर स्वयं को सिद्ध करने का उसका सपना अधूरा रह गया।

इस घटना का आघात बहुत गहरा था। बहुतों का मानना है कि इस एक घटना ने पूरे परिवार के वर्तमान और भविष्य को गहराई से झकझोर दिया।

রুশাইর বিয়েতে রাজেন্দ্রলাল ও মোক্ষদা সুন্দরী

Click for English Translation

ভাবছিলাম যদি রাজেন্দ্রলাল আর মোক্ষদা সুন্দরী তাঁদের পুতির বিয়ের চিফ অ্যাডভাইজর হতেন আর লাল কেল্লার থামগুলোর মত সটান দাঁড়িয়ে তদারক করতেন। হয়ত’, প্রথমেই বলে উঠতেন, “খুকি, এদের তো জ্ঞান-গম্মি কিছুই নেই, তুইই একটু দ্যাখ। খোকনের নাতি, নাম বুঝি রুশাই,  সে যে কেমন, কেমন তার পছন্দ, এগুলো সব আগে বুঝে নেওয়া দরকার।“ বিয়ের যেভাবে জোগাড়-যন্ত্র চলছে তাতে  মোক্ষদা সুন্দরী তো অবাক; এতো বরিশালের নিয়ম আচরণ কিছুই জানেনা! আমরা না হয় ছোটবেলা বিয়ে করেছিলাম তার পর  ক্লাস ফোরের খুনশুটি করেছি, কিন্তু এগুলো তো সব বুড়ো-ধাড়ি হয়েও কিছুই পারেনা। মোক্ষদার মুখটা যেন লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল, “জান-তো, আমি বৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করেছিলাম আর ও ফেল করেছিল। আমাকে খিমচি  দিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল। পরে ওসব নানা ল্যাজ জুড়লে কি হবে। ম্যাকমিলনের বই, রায়সাহেব— ও সব জানা আছে।“

আমি বলি কি, খোকার মত কেউ একজন সবল মানুষ থাকলে এদের সুবিধে হোত। আমাদের খোকাকে এরা কেমন যেন ভুলে গেছে, মাঝে মাঝে বেশ কষ্ট হয়। তবে, ঘেটুর ব্রিলিয়ান্ট মাথা, ও অনেকটা সাহায্য করে দিতে পারবে। কোনও ঝুট-ঝামেলা হলে লাকি আছে, সামলে নেবে।

খোকন তো অনেকটা ছোট, ওর ওপর বেশি প্রেশার না দেওয়াই ভালো। আমি জানি, পচু রান্নার কোথায় কি হবে সে সব বলে দেবে আর ঘরের বাচ্চারা উধম মচালে গল্পের ঝুড়ি নামিয়ে অনায়াসে শান্ত করে দেবে। আলপনা আর সাজানো? ওর জন্যে কি চিন্তা, ছবি তো আচ্ছেই, করে দেবে। আর বীণা? বাসরে গেয়ে দেবেখন দু কলি, “ফুলে ফুলে কি কথা—“   

একটু দম নিয়ে মোক্ষদা বললেন, কনু আর ননিও তো রুশাইর পিসি-ঠাকুমা, ওরাও অনুষ্ঠানটাকে সুন্দর করতে চাইবে।ওদেরও একটা ক্রিটিকাল দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

“এত বড় কাজে নানা খুঁটিনাটি থাকে, এতে ভুল-ভাল কিছুটা হবেই। ননী আর কনু তো সবসময়েই সজাগ। ওরা ম্যানেজমেন্টে কোথাও কোনও অসুবিধের গন্ধ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে শুধরে দেবার চেষ্টা করবে।“

একটু থেমে মোক্ষদা যেন সগর্বেই বললেন, “তুমি চিন্তা ক’রোনা আর বেশি বকাবকিও ক’রোনা বাপু । আমাদের বাচ্চারা আর সেই ছোট্টটি নেই, তার এখন ছেলেমানুষি ছেড়ে চিন্তাশীল – দায়িত্বশীল হয়ে গেছে। দেখো, ওরা ঠিক কাজটা সুন্দর করে সামলে দেবে।“

সব শুনে রাজেন্দ্রলালের মুখে যেন ছোট্ট হাসির রেখা ফুটে উঠল।

পাত্র-পাত্রী পরিচিতি: (১) রাজেন্দ্রলাল : রায়সাহেব রাজেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, (২) মোক্ষদা সুন্দরী: রাজেন্দ্রলালের পত্নী, (৩) খুকি:   রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর বড় মেয়ে, (৪)খোকা:  রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর বড় ছেলে, (৫) কনু: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর মেজ মেয়ে, (৬) পচু : রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর সেজ মেয়ে  (৭) ঘেটু:   রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর মেজ ছেলে, (৮) লাকি: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর সেজ ছেলে, (৯) ননী: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর চতুর্থ কন্যা, (১০) খোকন : রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর ছোট ছেলে,  (১১) ছবি : রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর পঞ্চম কন্যা, (১২) বীণা: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর ছোট মেয়ে

Prof. Sanjoy Bandopadhyay – Rrik’s father

Rajendralal and Mokshada Sundari at Rushai’s Wedding

I kept wondering what it would be like if Rajendralal and Mokshada Sundari were the chief advisors for their great-grandson’s wedding—standing tall and alert like the pillars of the Red Fort, overseeing everything. Perhaps they would begin by saying, “Khuki, these people don’t understand a thing. You look into it properly. Khokan’s grandson—what’s his name, Rushai?—you must first understand what he is like, what he prefers, how he feels about things.”

Watching the way the wedding preparations were unfolding, Mokshada Sundari would surely be astonished. “They know nothing of Barishal’s customs,” she would say. “We were married as children and still managed our little battles all the way till Class Four. But these grown-ups? They can’t manage a thing!”
Her face would flush with a strange mix of pride and embarrassment. “You know,” she might add, “I passed the scholarship exam and he failed. He pinched me so hard I bled! What’s the point of later pretending otherwise? Macmillan’s books, Ray Saheb… I know all of that too.”

To be honest, someone strong and dependable like Khoka would have been a great help. They seem to have forgotten him, and it hurts now and then. Still, Ghetu’s brilliant head will solve many problems, and if some sudden mess crops up, Lucky is always there to handle it.

Khokon is still quite young; it’s best not to put too much pressure on him. I know he’ll guide the cooks about what needs to go where, and if the little ones get too mischievous, he can pull out his basket of stories and calm them down in no time.
Alpana and decorations? Why worry—Chhobi is there, she’ll take care of it.
And Bina? She’ll surely sing a couple of sweet lines in the bridal chamber—“Phule phule ki katha…”

After catching her breath, Mokshada continued, “Konu and Noni are also Rushai’s grandmothers in a way—they too will want the ceremony to be beautiful. They should take up some important responsibilities as well.”

“In such a big event, there will always be a hundred little details. Mistakes will happen. But Noni and Konu are always alert. The moment they sense something is not right, they will leap in and try to fix it.”

She paused, then said proudly, “Don’t worry, and don’t scold them too much. Our children aren’t little anymore. They’ve left behind childishness and become thoughtful, responsible people. You’ll see—they will manage everything beautifully.”
Hearing all this, a faint smile appeared on Rajendralal’s lips.

Characters:

  1. Rajendralal – Rai-Saheb Rajendralal Bandyopadhyay, 2. Mokshada Sundari – Wife of Rajendralal, 3. Khuki – Eldest daughter, 4. Khoka – Eldest son, 5. Konu – Second daughter, 6. Pochu – Third daughter, 7. Ghetu – Second son, 8. Lucky – Third son, 9. Noni – Fourth daughter, 10. Khokon – Youngest son, 11. Chhobi – Fifth daughter, 12. Youngest daughter – Bina

দুম!!! চোখে ধুতরো ফুল, কানে তালা, হাত ফেটে চৌ-চিড়

দুম করে একটা বিশাল আওয়াজ! চোখে ধুতরো ফুল দেখছি, কানে কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছিনা, হাতের চামড়া ফেটে গ্যাছে—! পাপা, মানে আমার বাবা, পুজো করছিলেন, এক লাফে মেঝের আসন থেকে সোজা বারান্দায়, “কি হল, কি হল?”। বললেন, “এতো বড় আওয়াজ? আমি তো কানে কিছু শুনতে পাচ্ছিনা,  —“। তখনই নজর গেল বিছানার ওপর, ওখানে আমার বছর খানেকের ছোট্ট মেয়ে শোয়া। আমি কানে শুনতে পাচ্ছিনা, পাপা চেঁচামেচি করছে – সেও শুনছেনা, তাহলে মিমের কি হল? মিম আমার ছোট্ট মেয়ে; কানে কালা হয়ে গেল না তো! ও শুয়ে আছে কিন্তু তেমন কোনও আওয়াজ করছেনা। ডাকলাম, তেমন কোনও সাড়াও দিচ্ছেনা। আমরা সবাইই খুব ভয় পেয়ে গেলাম।

ঘটনাটা হয়েছিল আমার হঠাৎ মনে জেগে ওঠা বীর হবার আকাঙ্ক্ষায়। সেদিন দীপাবলী। আমাদের তিনতলার বারান্দায় তখনও গ্রিল ওপর অবধি ওঠেনি, ওটা উঠেছিল বেশ কয়েক বছর পর, সেও এক বিরাট ঘটনা। আমার ছেলের হনুমান বা বেড়াল ইন্সপায়ার্ড চেষ্টা আর ন-বছরের মিমের ভাইকে বাঁচিয়ে নেওয়া, আর নিচে জয়সওয়ালজী পরিবার মোটা বেডকভার নিয়ে দাঁড়ানো, লাফ দিলে ধরবে বলে। এই গল্প অন্য একদিন হবে।

আবার আমার বীর হবার কথায় আসি। দীপাবলীর দিন – চার-দিকে বাজি ফাটছে। আমার গিন্নির বাজি ফাটানোর খুব শখ, বিশেষ করে শব্দ-বাজি। বেশ কয়েকটা বড় বড় চকোলেট বোম কিনেছিলাম। হাতে ধরে বোমে আগুন ধরিয়ে না ফাটাতে পারলে তো ব্যাপারটা জমলই না। বোম জ্বালানোর নানা রকম প্রসেস আছে, আপনারা সবাই জানেন। প্রথম হচ্ছে,  দূর থেকে আগুন না ধরিয়েই তিনবার দৌড়ে পালিয়ে সাকসেসফুল হওয়ার চেস্টা বা সলতের ওপর কাগজ লাগিয়ে ভয়ে ভয়ে জ্বালান, আর তৃতীয়টি হচ্ছে বীরের মতো হাতে ধরে জ্বলানো – তারপর সলতে তে আগুন লাগলে অনায়াসে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। ওই শেষেরটা করতে গিয়েই আমার যত বিপত্তি। সলতে আগুন লাগতেই ঝপ করে জ্বলে গিয়ে আমার হাতেই ফেটে গেল। বাকি তো আগেই বলেছি।

সে রাত্রে আর হলোনা, পরের দিন পৌঁছুলাম আমাদের ডাক্তার মিশ্রজীর চেম্বার। সে যাত্রা আমরা সবাই-ই মোটামুটি বেঁচে গেলাম, মিম তো পরের দিনই ফিট, আমার হাত সারতে সপ্তাহ খানেক সময় নাগল। বাকি, শুধু পাপারই মনে হল যে আমার বাজির আওয়াজেই ওনার কানটা বিগড়েছে। এটা কিছুতেই বোঝানো গেলনা যে ওটা সলতের দোষ, অত তাড়াতাড়ি বারুদে না পৌঁছুলেই হচ্ছিলনা? বোমটারই বা অত ভয়ঙ্কর ভাবে ফাটার কি দরকার ছিল। ড্যাম্প খেয়ে বাবুরাম সাপুড়ের সাপের মতো ফুস ও তো করলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হোত। যত দোষ সব আমার ঘাড়েই পড়ে, ভাবছি এপিঠ-ওপিঠ করে নাম বদলে ‘নন্দ ঘোষ’ হয়ে যাব।   

কাজল আর গরম – সাথে মিয়াঁ-কী-সারঙ

Click for Hindi version || Click for English version

যাদবপুরের ২০ বিধান পল্লীর বাসাবাড়িতে ৬০, ৭০, ও ৮০র দশক মিলিয়ে আমরা বহু-বছর কাটিয়েছি। সে বাড়ীর গল্প আরেকদিন বলব, আজ অন্য একটা গল্প বলি। এটা ৭০ দশকের মাঝামাঝির কথা, আমরা ওই বাড়ীতেই থাকি। বিধান পল্লীর ওই পাড়াতে আমার বন্ধুদের মধ্যে চার-জনের সাথেই বেশী সময় কাটত। আশপাশের মানুষজন, বিশেষ করে পাপা [আমার বাবা] অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন যে এদের এত কি গ্যাজানোর থাকে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেঁজিয়েও স্টক শেষ হয়না। এখন বুড়ো হয়ে নিজেকে দিয়েই ব্যাপারটা বুঝতে পারি যে এটা চিরকালের সত্য; মানে, বয়সে বড় হলেই ছোটদের চাপে ফেলার নানা চক্রান্ত মাথার মধ্যে কিলবিল করে।

তখন গরমের ছুটি। পড়াশুনোর জন্য আমার সেতার বাজনা কখনোই চাপে পড়েনি, কারণটা খুব সোজা, পড়াশুনোর কথা ভাবলেই গা জ্বালা করত, কেউ পড়াশুনো করতে বললেও করতাম না। সেতার বাজাতে যে সবসময়ে দারুণ লাগত তা নয়, তবুও পড়াশুনোর থেকে অনেক ভালো। আর রবিশঙ্কর কে দেখে খুব উৎসাহিত হতাম, কিন্তু ওনাকে যে রবিশঙ্করজী, পণ্ডিত রবিশঙ্কর বা কম করে পন্ডিতজী বলে সম্বোধন করা উচিত সেই ভদ্রতাটুকুও জানতাম না। সে সময় আমার আশপাশের বাঙালী মানুষ “আহা, রবিশঙ্কর বা বিলায়েত বা নিখিল কি ভালো বাজাল” এ ভাবেই নাম-প্রয়োগ করত। ওস্তাদজী একদিন আমাকে সুন্দর করে ঝেড়ে পালিশ করে দিলেন, “এই ছোড়া, ওনাকে পণ্ডিত রবিশঙ্কর বা রবিশঙ্করজী বলবে, শুধু নাম নিয়ে নয়।“ সেদিন থেকে জঙ্গলী থেকে সভ্যতার কিছুটা কাছাকাছি এলাম।   

কিন্তু যে গল্পটা বলার জন্যে লেখাটা শুরু করেছিলাম তার থেকে বার-বার দুরে চলে যাচ্ছি। আজকের গল্প কাজলকে নিয়ে। যে চার বন্ধুর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তার হচ্ছে শোভন, কাজল, রবি, আর আমি। চার জন চার প্রান্তের, এঁদের সব কিছুই আলাদা, শুধু আড্ডা মারাটা সবারই পছন্দ ছিল। এদের কেউ ছিল ধর্মেন্দরের ভক্ত, কেউ মা কালীর, কাজল ছিল অভক্ত, আর আমি না ঝোলে না অম্বলে – মানে ভক্তাভক্ত।  ভক্তাভক্ত শব্দটা কি বুঝিয়ে বলতে হবে? ওটা সুবিধেবাদী পার্টির মেম্বার, যখন যেমন তখন তেমন, যখন সুস্বাদু প্রসাদ নাকের সামনে ঝুলছে তখন ভক্ত হয়ে খুড়োর কল লম্বা করে সানন্দে চেটেপুটে খাওয়া, আর সেটা না হলে ও নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই।

বন্ধূরা কেউই খুব সিরিয়াসলি গান-বাজনা শেখা-করা করতনা, কিন্তু আমাকে সাপোর্ট করত। এদের মধ্যে শোভনের মা ও বাবা গান-বাজনা করতেন, ওর মা বিদুষী দীপ্তি চন্দ খুব ভালো সেতার বাজাতেন। বৌদি কে নিয়ে কখনও লেখার ইচ্ছে আছে। শোভনের মা কে বৌদি ডাকতাম আর শোভনের সাথে পরিচয়ের অনেক আগের থেকেই ওনার ভালোবাসা পেয়েছি।

সেদিন খুব গরম পড়েছিল, পিচের রাস্তায় পা ছোঁয়ানো যাচ্ছেনা। সে সময়ে খালি পায়ে চলার অভ্যেসটা একেবারে চলে যায়নি। আমার একটা বাজনার ঘর ছিল, সে ঘরের দেয়াল কিছুটা মোটা থাকার জন্য অন্য পাতলা ছাদের ঘরের থেকে কিছুটা ঠান্ডা থাকত। দুপুর দুটো, ঘরের জানলাগুলো বন্ধ করে দিলাম যাতে সেতারের আওয়াজ ভালো শোনা যায়, ঘর অন্ধকার, শুধু অল্প ফাঁটা জানালার ফোকরগুলো দিয়ে অল্প অল্প আলো ঢুকছে তাতে একটা অদ্ভুত আমেজ তৈরি হয়েছে। ঘরে একটা ঘরঘরে টেবিল ফ্যান ছিল, সেটা বন্ধ; আমি মিয়াঁ-কী-সারং নিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ বাজাতে বাজাতে মনে হল দেখি তো কাজল কি করছে, এক-আধজন শ্রোতা থাকলে বাজনাটা জমে ভালো। টুক করে চলে গেলাম কাজলের বাড়ী, তিরিশ সেকেন্ডের পথ। পৌঁছে দেখলাম কাজল মেঝেতে শুয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে উঠে বসল। আমি বললাম, “কি রে ঘুমোচ্ছিস?” এই প্রশ্নতে ও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল, “শালা, এই গরমে কেউ ঘুমোতে পারে?” দেখলাম এসবেস্টসের ছাতের নিচে পাখাটা বেশ জোরেই ঘুরছে, কিন্তু তাতে ঠান্ডা করার থেকে গরমই যেন বেশি হচ্ছে। বললাম,”আমি সেতার নিয়ে বসেছি, তুই কি আসবি?”  সামনেই হাওয়াই চপ্পল রাখা ছিল, ওটা পায়ে গলিয়েই আমার সাথে বেরিয়ে পড়ল।

ঘরের মধ্যে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “সব দরজা-জানালা বন্ধ করে রেখেছিস?” আমার সুর-পালিয়ে যাবার লজিক ওর যুক্তিপূর্ণ মনে হল আর কোনও কথা না বাড়িয়ে শুনতে বসে গেল। আমি তো জমিয়ে আলাপ, তার পর বিলম্বিত জোড়, গমক জোড় বাজাচ্ছি। প্রায় ঘণ্টা খানেক হয়ে গিয়েছে; দেখলাম আমার মতন ও ও কুল কুল করে ঘামছে। আস্তে আস্তে আমাকে বলল, “বেশ বাজাচ্ছিস, বাজিয়ে যা, আমি এক্ষুনি একটু ঘুরে আসছি।“ আমি তার পর, নানা অঙ্গের গমক জোড়, নানা রং বেরঙের বোল তান, একহারা তান, উল্টো ঝালা, ঠোক ঝালা, সোজা ঝালা সব বাজিয়ে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, কিন্তু কাজল তো ফিরলোনা! আমি ভাবলাম, কি হলো? সেতার রেখে, চপ্পল পায়ে গলিয়ে ওর বাড়ী গিয়ে হাজির হলাম, দেখলাম মাঝেত ওই গরমের মধ্যে ভোস ভোস করে ঘুমোচ্ছে।

বুঝলাম ওই অসহ্য গরম আর আমার দরজা জানলা বন্ধ গুমোট ঘরটা কাজে দিয়েছে।

काजल और गर्मी साथ में मियाँ-की-सारंग 

जादवपुर के 20 विधान पोललि के मकान में हमने 60, 70 और 80 के दशक मिलाकर कई साल बिताए हैं। उस घर की कहानी किसी और दिन कहूँगा, आज एक अलग कहानी सुनाता हूँ। यह 70 के दशक के बीच की बात है, हम उसी घर में रहते थे। विधान पल्ली के उस मोहल्ले में मेरे दोस्तों में चार के साथ ही ज़्यादा समय कटता था। आस-पड़ोस के लोग, ख़ासकर पापा [मेरे पिता] तंग हो जाते थे कि इनके पास इतना क्या गपशप है जो घंटों गपियाने के बाद भी ख़त्म नहीं होता। अब बूढ़ा होकर खुद को देखकर समझ पाता हूँ कि यह तो चिरंतन सत्य है; मतलब, उम्र बढ़ते ही छोटे लोगों पर दबाव डालने के तरह-तरह के षड्यंत्र दिमाग़ में कुलबुलाने लगते हैं।

उस समय गर्मियों की छुट्टियाँ थीं। पढ़ाई की वजह से मेरा सितार बजाना कभी दबा नहीं, वजह बहुत सीधी थी—पढ़ाई का नाम सुनते ही तन-बदन में जलन होती, कोई कहता भी तो मैं पढ़ाई नहीं करता। सितार बजाना हर समय बहुत अच्छा लगता था ऐसा नहीं, फिर भी पढ़ाई से कहीं बेहतर था। और रविशंकर को देखकर बहुत प्रेरणा मिलती थी, लेकिन उन्हें “रविशंकरजी,” “पंडित रविशंकर” या कम से कम “पंडितजी” कहना चाहिए यह शिष्टाचार मुझे पता नहीं था। उस समय मेरे आस-पास के बंगाली लोग बस ऐसे ही कहते—“आहा, रविशंकर या विलायत या निखिल क्या अच्छा बजाया।” एक दिन उस्तादजी ने मुझे अच्छे से डाँट-फटकारकर कह दिया, “अरे छोकरा, उन्हें पंडित रविशंकर या रविशंकरजी कहो, केवल नाम लेकर नहीं।” उस दिन से जंगलीपन से थोड़ी-सी सभ्यता की ओर बढ़ा।

लेकिन जो कहानी कहने बैठा था, उससे बार-बार भटक जा रहा हूँ। आज की कहानी काजल को लेकर है। जिन चार दोस्तों का ज़िक्र करके शुरू किया था वे थे—शोभन, काजल, रवि और मैं। चारों अलग-अलग, सब कुछ अलग, केवल अड्डेबाज़ी सबको पसंद थी। कोई धर्मेन्द्र का भक्त था, कोई माँ काली का, काजल था अभक्त, और मैं था “भक्ताभक्त”—मतलब, न इधर न उधर। भक्ताभक्त का मतलब समझाना पड़ेगा क्या? वह सुविधाभोगी पार्टी का सदस्य—जब जैसा, तब वैसा। जब स्वादिष्ट प्रसाद सामने लटक रहा हो तब भक्त बनकर खूब चटखारे से खाना, और जब न हो तो कोई परवाह नहीं।

दोस्तों में कोई भी बहुत गंभीरता से गाना-बजाना सीखता नहीं था, लेकिन मुझे सपोर्ट करते थे। इनमें शोभन की माँ और पिता संगीत से जुड़े थे। उसकी माँ, विदूषी दीप्ति चंद, बहुत अच्छा सितार बजाती थीं। बौदी के बारे में कभी लिखने का मन है। शोभन की माँ को हम बौदी कहते थे और शोभन से जान-पहचान से बहुत पहले ही मुझे उनका स्नेह मिला था।

उस दिन बहुत गर्मी थी, डामर की सड़क पर पैर रखना मुश्किल। उस समय नंगे पाँव चलने की आदत अभी पूरी तरह गई नहीं थी। मेरा एक बजाने का कमरा था, जिसकी दीवारें थोड़ी मोटी थीं, इसलिए पतली दीवारों वाले कमरों से थोड़ा ठंडा रहता था। दोपहर के दो बजे, मैंने खिड़कियाँ बंद कर दीं ताकि सितार की आवाज़ साफ़ सुने। कमरा अंधेरा, बस झिरीदार खिड़की से हल्की रोशनी आ रही थी, जिससे अजीब-सा वातावरण बन गया था। कमरे में एक पुराना टेबल-फैन था, वह भी बंद। मैं मियाँ-की-सरंग लेकर बैठ गया। कुछ देर बजाने के बाद सोचा—देखूँ काजल क्या कर रहा है, एक-दो श्रोता हों तो बजाने का मज़ा आता है। फटाफट काजल के घर गया, तीस सेकंड की दूरी। पहुँचा तो देखा काजल ज़मीन पर लेटा सोने की कोशिश कर रहा है। मुझे देखकर उठ बैठा। मैंने पूछा, “क्या रे, सो रहा है?” इस सवाल पर वह झल्लाकर बोला, “साला, इस गर्मी में कोई सो सकता है?” देखा, ऐसबेस्टस की छत के नीचे पंखा ज़ोर से चल रहा था, लेकिन उससे ठंडक से ज़्यादा गर्मी लग रही थी। मैंने कहा, “मैं सितार लेकर बैठा हूँ, तू आएगा क्या?” सामने ही हवाई चप्पल रखी थी, वह पहनकर मेरे साथ निकल पड़ा।

कमरे में घुसकर उसने पूछा, “सभी दरवाज़े-खिड़कियाँ बंद कर रखी हैं?” मेरे “सुर भाग जाएगा” वाले तर्क को उसने तर्कसंगत पाया और बिना और सवाल किए सुनने बैठ गया। मैं तो जमकर आलाप, फिर विलंबित झोर, गमक झोर बजाने लगा। लगभग एक घंटा हो गया; देखा कि मेरी तरह वह भी पसीने से तर-बतर हो रहा है। धीरे से बोला, “अच्छा बजा रहा है, बजा, मैं अभी थोड़ी देर घूमकर आता हूँ।” फिर मैं अलग-अलग अंगों का गमक झोर, रंग-बिरंगे बोल-तान, एकहरा तान, उल्टा झाला, ठोक झाला, सीधा झाला—सब बजाता रहा लगभग 1 घंटा 40 मिनट। लेकिन काजल तो लौटा ही नहीं! मैंने सोचा, क्या हुआ? सितार रखकर, चप्पल पहनकर उसके घर पहुँचा। देखा, उसी तपती गर्मी में वह जोर-जोर से खर्राटे लेकर सो रहा है।

तब समझा कि उस असह्य गर्मी और मेरे दरवाज़ा-खिड़की बंद घुटनभरे कमरे ने अपना काम कर दिया था।

Kajal and the Heat – with Miyan-ki-Sarang

In the house at 20 Bidhan Palli, Jadavpur, we spent many years across the 1960s, ’70s, and ’80s. The story of that house I will tell another day; today, let me share a different one. This goes back to the mid-1970s, when we were still living there. Among my friends in that neighborhood, there were four with whom I spent most of my time. The people around, especially Papa [my father], would be exasperated—“What on earth do these boys chatter about for hours on end, and still they don’t run out of stock?” Now that I have grown old, I understand from within myself that this is an eternal truth; meaning, as soon as one grows older, conspiracies to subdue the younger ones start wriggling in the mind.

It was summer vacation then. My sitar practice was never suppressed for the sake of studies—simply because even the thought of studies made my whole being burn. If someone told me to study, I simply wouldn’t. Playing the sitar didn’t always feel thrilling, but still it was far better than studies. I was greatly inspired seeing Ravi Shankar, but I didn’t even know the courtesy of addressing him as Ravi Shankar-ji, Pandit Ravi Shankar, or at least Pandit-ji. The Bengalis around me would just say—“Ah, what wonderful playing by Ravi Shankar, or Vilayat, or Nikhil.” One day Ustad-ji polished me off thoroughly, saying, “Hey boy, call him Pandit Ravi Shankar or Ravi Shankar-ji, not just by name.” From that day, I came a little closer to civilization from wildness.

But I keep straying away from the story I sat down to tell. Today’s story is about Kajol. The four friends I mentioned at the beginning were Shovon, Kajol, Ravi, and me. Four people from four different ends—everything about them was different, except that all loved spending time in adda (casual banter). One was a devotee of Dharmendra, another of Ma Kali, Kajol was a non-believer, and I was “bhakt-abhakt”—neither here nor there. Should I explain that word? It meant a member of the opportunist party: when the occasion demanded, one turned into a devotee—say, when delicious prasad dangled before the nose, then stretching the uncle’s pulley, happily licking it clean; and otherwise, no concern at all.

None of the friends pursued music seriously, but they supported me. Among them, Shovon’s mother and father were into music. His mother, Vidushi Deepti Chanda, played the sitar very well. I hope to write about Boudi sometime. We used to call Shovon’s mother Boudi, and even long before I knew Shovon, I had received her affection.

That day it was extremely hot—you could not set your foot on the tar road. At that time, the habit of walking barefoot hadn’t entirely disappeared. I had a music room of my own, with walls a little thicker than the other thin-walled rooms, so it stayed slightly cooler. At two in the afternoon, I shut the windows so the sitar sound would be heard well. The room was dark, only slivers of light entered through the narrow cracks of the closed shutters, creating a strange ambience. There was an old table fan, switched off. I sat down with Miyan-ki-Sarang. After playing for a while, I thought—let me see what Kajol is doing; music feels livelier with at least one listener. I dashed over to Kajol’s house, just thirty seconds away. I found him lying on the floor, trying to sleep. Seeing me, he sat up. I asked, “Hey, sleeping?” At that question, he flared up: “Damn it, in this heat can anyone sleep?” I noticed the fan under the asbestos roof was spinning quite hard, yet it seemed to produce more heat than coolness. I said, “I’ve sat down with my sitar, want to come?” His slippers were right there; he slipped them on and came with me.

Entering my room, he asked, “You’ve shut all the doors and windows?” My logic that “the sound would escape” seemed convincing enough to him, so without further debate he sat to listen. I started with a proper alap, then vilambit jod, gamak jod. An hour passed; I saw that like me, he too was dripping with sweat. Slowly he said, “Playing well, keep at it, I’ll just step out for a bit.” Then I went on—gamak jod in various styles, colorful bol-taans, ekhara taans, reverse jhala, thok jhala, straight jhala—playing for nearly 1 hour 40 minutes. But Kajol never returned! I wondered, what happened? Leaving the sitar aside, slipping on my sandals, I went to his house. There he was, in the middle of that unbearable heat, sleeping soundly with loud snores.

I realized then—the suffocating hot room with closed doors and windows had done its job.

আমার ভুড়ি ও কুট্টিদিদি

কুট্টিদিদি একজন সোজা-সরল-নিদাগ মানুষ। নিজের বানানো ছোট্ট জায়গায় নানা রঙের অনুভূতি নিয়ে বাঁচেন। প্রায়ই ওর কলমে নানা জানা-অজানা অনভূতি ধরা পড়ে যায়, মানুষকে সুযোগ করে দেয় ওকেই অন্য চোখে দেখার। আমি সাহিত্য ভালবাসি বললে সেটা সঠিক হবে না, আমার সাহিত্য নিয়ে লেখা-পড়া শুরু হয়েই ফস করে শেষ হয়ে যায়। তবুও কখনও কখনও কুট্টিদিদির কোনকোন লেখা পড়ে মনে হয়, “এ তো বেশ! লেখাটা যেন টুক করে পুরো মনটা দখল করে দুম করে রাজত্ব শুরু করে দিল।“   

বুঝেই উঠতে পারছিলাম না আমার পেটটা ক্রমাগত এত বড় হয়ে যাচ্ছে কেন।  একবার ভাবলাম বাচ্চা হবে, পরে ভাবলাম, না না, ওসব পুরুষ-মানুষের পেটের ভাগ্যে নেই। দু-একজন বলল, ওটা  গেলাসে-গেলাসে মদ, বাক্স-বাক্স গঙ্গুরামের কাঁচা-গোল্লা, আর আরসালানের এগ-রোল মিশে কেমিক্যাল রিয়াকশনে  হচ্ছে। মদ ছেড়ে দিলাম, খাওয়াও প্রায় ছেড়ে দেখলাম, হাঁটা-হাঁটি শুরু করলাম; কিসুতেই কিস্সু  না, পেটের নো নড়ন চড়ন, যেমন-তেমনই ঠ্যাটার মতো দাঁড়িয়ে আছে।

যাক, এতদিন পর কারণটার নাগাল পেয়ে খপ করে ধরে ফেলেছি। এখন আমি পাক্কা জানি ওটা তোর দেওয়া গ্যাসের ফল। এটা কিন্তু এক্কেবারে সন্দেহাতীত – কল্পনাতীত। ঠিক ধরেছি না? তুইই বল।    

একগুচ্ছ দুষ্টুমি-চিরকুট

তিনদিন হলো ছোড়দির চোখের ছানি কেটেছে। নতুন করে স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার মহা-সুখ। এর মধ্যেই কিছুটা জ্বালানোর জন্যে দু-চারটে ডিজিটাল চিরকুট পাঠিয়ে দিলাম। বিশ্বাস করে বললাম, কথাটা কিন্তু আপনারা আবার ফাঁস করে দেবেননা।  

১৮ জুলাই। ২০২৫

চিরকুট – ১

তোর ছোট্ট চিরকুট পেয়েই বুঝলাম তুই চোখ-ভরে আবার দেখতে পাচ্ছিস। ভাবলাম খবরটা গুরুদেবকে দিয়ে দিই। উত্তরে উনি তোকেই সোজাসুজি লিখলেন;


“তোমার সংবাদ পেয়ে হৃদয় জুড়ে প্রশান্তি নামল—জানলাম, তোমার দৃষ্টির জগৎ আবার উন্মোচিত হয়েছে। চিকিৎসকের কৃতিত্ব সত্যই প্রশংসনীয়।
তবে বলো তো, তাঁকে পুনরায় দেখে তোমার অন্তরে কেমন অনুভব জাগে? অপারেশনের পূর্বে যে প্রতিচ্ছবি ছিল, তার তুলনায় আজকের রূপ কতখানি পরিবর্তিত?
তিনি কি পূর্বেই ছিলেন সৌন্দর্যের আধার, না কি অপারেশনের পর নতুন এক দীপ্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন?”

চিরকুট – ২

তোর অপারেশনের খবরটা চাটুজ্জে-বাবুকে [বঙ্কিম] জানিয়েছিলাম। উনিও তোকে দু-কলম লিখে পাঠিয়েছেন।

“জানিতে পারিলাম—আপনার চক্ষু পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে। ইহা কেবল শল্যচিকিৎসার সার্থকতা নহে; ইহা এক ঈশ্বরসঞ্জাত অনুগ্রহ, যাহা মানবশরীরের সীমা ভেদ করিয়া আত্মার আলয় স্পর্শ করে।
যাহাকে আপনি পুনরায় দেখিতে পাইতেছেন, তাহার প্রতিমূর্তি কি পূর্বের ন্যায় কেবলই রূপসৌন্দর্যের বাহ্যপ্রকাশ, না কি, ঈশ্বরের দর্শনে অন্তর্জগতে বিকশিত হইয়াছে এক নূতন উপলব্ধি—যে রূপ অদৃশ্য, কিন্তু অনির্বচনীয়?
মানুষটির মুখচ্ছবিতে কি ঈশ্বরের সৃষ্টির এক অপূর্ব শোভার আভাস পাইতেছেন—যাহা পূর্বে ছিল অস্পষ্ট, কিন্তু আজ যেন দৃষ্টি নয়, হৃদয়ের সহিত প্রত্যক্ষ?”

চিরকুট – ৩

ছানি অপসারণ ও পুনর্লব্ধ দৃষ্টির দুঃখ

যখন চশমা পরিধান করিয়াও স্পষ্ট দেখিতে পাইতাম না তার সুখ তখন অবধারনের ক্ষমতা ছিলনা; ছানি অপসারণ উপরান্ত তার স্পষ্ট অবলোকন হইল।বুঝিলাম দৃষ্টি-লাভের দুষ্পরিণাম। যখন কম দেখিতে পারিতাম তখন আশপাশের কুৎসিত আকৃতি তেমন দৃষ্টিগোচর হইতনা, মনের রঙে সুশোভিত হইয়া মনের আয়নায় ধরা দিত। এখন সে সুখের দিন গিয়াছে, বাকি জীবন বোধ করি এই যন্ত্রণা নিয়াই চলিতে হইবে।  

চিরকুট – ৪

তোর ছানি অপারেশনের খবর জেনে মাইকেল তো অদ্ভুত লিখলেন, লিখলেন ছানি অপসারণের বিপক্ষে; যেমন স্বভাব।    

দৃষ্টির পুনর্জাগরণে বিমূঢ় হৃদয়বেদনা

হে চিরন্তন প্রকৃতি! এক সময় ছিল, যবে দৃষ্টির দীনতা মোরে করুণাভরে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। চশমার কাচের অন্তরাল দিয়া জগৎ যাহা দেখা দিত, তাহা এক প্রকার মায়ার আবরণে আচ্ছাদিত স্বপ্নলোকের ন্যায় মনে হইত। তাহা ছিল অস্পষ্ট, অথচ মোহনীয়—চিত্ররূপিনী বাস্তবতা নহে, বরং হৃদয়ের রঙে রঞ্জিত এক কল্পলোক।

কিন্তু বিধি হায়! সেই করুণা অপসারিত হইল, যখন চিকিৎসার কুশল স্পর্শে ছানির অন্তরাল অপনোদিত হইয়া, নির্মম জগতের নিরাভরণ চেহারা প্রকাশ পাইল। দৃষ্টি হইল তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট, নির্মোহ।

হায়! ইহাই কি কাঙ্খিত?

এতদিন যাহা ছিল বিমূর্ত, তাহা হঠাৎ হইয়া উঠিল রূঢ় বাস্তব। চারিপাশ—যাহা একদিন মুগ্ধতার ছায়াপটে স্নিগ্ধ ও কোমল দেখাইত, আজ তাহারা উদ্ভট, বিকৃত, কর্কশ চেহারায় মোর হৃদয় বিদীর্ণ করে। পূর্বে যাহা অন্তরে ফুলের মালা রচিয়া দিত, আজ তাহাই করিল কণ্টকের আঘাত।

এখন, এই জীবনপ্রান্তে, আমি বাধ্য হইয়াছি সহিতে স্পষ্টতার শাস্তি। আর রঙ্গিন কল্পনার দিন নাই। রইল শুধু উজ্জ্বল অথচ বিষণ্ন এক জগত—যাহার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন চিৎকার করিয়া বলে, “স্বপ্ন নহি, আমি বাস্তব!” এবং সেই বাস্তবই আজ মোর শাস্তি, মোর তপস্যা, মোর যন্ত্রণা।

চিরকুট – ৫

ছানি-অপসারণের বিপক্ষে  মাইকেল আবার লিখলেন —

দৃষ্টির পুনর্জাগরণে বিমূঢ় হৃদয়বেদনা

হে প্রাচীন ধরণী! হে চিরজ্যোতিষ্মতী!
শ্রাবণের মেঘমালা যেমন ঢাকে দিবাকর,
তদ্রূপ মোর দৃষ্টি ছিল নিভৃত, স্নিগ্ধ, সংকীর্ণ,
স্বপ্ন-রেখা-রঞ্জিত, মনের বর্ণে মোহন কর।

চশমার কাঁচে ঢাকা বিশ্ব ছিল ছায়াপথ,
না ছিল কণ্টক, না ছিল বিক্ষোভের কর্কশতা।
অলীক ললাটে আঁকা রঙিন কল্পলোক,
রূপ নয়, রস নয়—প্রেমপুট রচিত ব্যথা।

কিন্তু হায়, অনিবার্য নিয়তির করাঘাতে,
চিকিৎসার তীর খচিত অণু-যন্ত্রের ছোঁয়ায়,
যখন ছানি নামক মরীচিকা করিল পলায়ন,
দেখিলাম জগত—নগ্ন, নির্মম, নৃশংস ছায়া।

দৃষ্টি হইল তীক্ষ্ণ, বলিয়াছে—“দেখ হে মানুষ!”
অতঃপর রহিল না স্বপ্নলোকের মৌন কুসুম,
যাহা ছিল কুৎসিত, হইল আরও কদর্য,
রূপ রহিল না, রহিল কেবল জ্বালাময় বিষণ্নতা।

যাহা ছিল অন্তঃলোকে অলঙ্কাররূপে সজ্জিত,
আজ তাহা দংশে মোর হৃদয়—রক্ত-নিসৃত।
যাহা ছিল কুসুমিত মালা, গন্ধ-মাতাল,
তাহাই হইল কাঁটা—চৈতন্যে বিষবৎ কাল।

হে করুণ বাস্তব! তুমি কি পরিত্রাতা, না যমদূত?
তোমার মুখশ্রীতে দীপ্তি নাই, কেবল দন্তরশ্মি।
দেখা পাই—তব রেখা, তব গঠন, তব ক্ষুদ্রতা,
কিন্তু নাই অনুভবের গীত, নাই প্রেমের শ্রী।

এই তপস্যা, এই দহন, এই জীবনের অভিশাপ,
স্পষ্টতার বিষপাত্র পান করিতেছি বিনা দ্বিধায়।
রহিল না আর আবরণ, রহিল না আঁখিপাতের কল্পনা,
রহিল শুধু বেদনায় দীপ্ত এক নির্মোহ, তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনা।

আজ মোর নিঃশেষ দৃষ্টি—দণ্ডবৎ সত্যের প্রতি,
যেখানে কল্পনার রমণী বিলীন—সুন্দরী মৃত।
উজ্জ্বল এই জগৎ, হে বন্ধু, জ্বালা দিয়া জাগায়,
চিৎকার করিয়া বলে—“আমি স্বপ্ন নহি, আমি চির সত্য!”

সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৽ কলকাতা ৽ ২১ জুলাই, ২০২৫