রুশাইর বিয়েতে রাজেন্দ্রলাল ও মোক্ষদা সুন্দরী

Click for English Translation

ভাবছিলাম যদি রাজেন্দ্রলাল আর মোক্ষদা সুন্দরী তাঁদের পুতির বিয়ের চিফ অ্যাডভাইজর হতেন আর লাল কেল্লার থামগুলোর মত সটান দাঁড়িয়ে তদারক করতেন। হয়ত’, প্রথমেই বলে উঠতেন, “খুকি, এদের তো জ্ঞান-গম্মি কিছুই নেই, তুইই একটু দ্যাখ। খোকনের নাতি, নাম বুঝি রুশাই,  সে যে কেমন, কেমন তার পছন্দ, এগুলো সব আগে বুঝে নেওয়া দরকার।“ বিয়ের যেভাবে জোগাড়-যন্ত্র চলছে তাতে  মোক্ষদা সুন্দরী তো অবাক; এতো বরিশালের নিয়ম আচরণ কিছুই জানেনা! আমরা না হয় ছোটবেলা বিয়ে করেছিলাম তার পর  ক্লাস ফোরের খুনশুটি করেছি, কিন্তু এগুলো তো সব বুড়ো-ধাড়ি হয়েও কিছুই পারেনা। মোক্ষদার মুখটা যেন লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল, “জান-তো, আমি বৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করেছিলাম আর ও ফেল করেছিল। আমাকে খিমচি  দিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল। পরে ওসব নানা ল্যাজ জুড়লে কি হবে। ম্যাকমিলনের বই, রায়সাহেব— ও সব জানা আছে।“

আমি বলি কি, খোকার মত কেউ একজন সবল মানুষ থাকলে এদের সুবিধে হোত। আমাদের খোকাকে এরা কেমন যেন ভুলে গেছে, মাঝে মাঝে বেশ কষ্ট হয়। তবে, ঘেটুর ব্রিলিয়ান্ট মাথা, ও অনেকটা সাহায্য করে দিতে পারবে। কোনও ঝুট-ঝামেলা হলে লাকি আছে, সামলে নেবে।

খোকন তো অনেকটা ছোট, ওর ওপর বেশি প্রেশার না দেওয়াই ভালো। আমি জানি, পচু রান্নার কোথায় কি হবে সে সব বলে দেবে আর ঘরের বাচ্চারা উধম মচালে গল্পের ঝুড়ি নামিয়ে অনায়াসে শান্ত করে দেবে। আলপনা আর সাজানো? ওর জন্যে কি চিন্তা, ছবি তো আচ্ছেই, করে দেবে। আর বীণা? বাসরে গেয়ে দেবেখন দু কলি, “ফুলে ফুলে কি কথা—“   

একটু দম নিয়ে মোক্ষদা বললেন, কনু আর ননিও তো রুশাইর পিসি-ঠাকুমা, ওরাও অনুষ্ঠানটাকে সুন্দর করতে চাইবে।ওদেরও একটা ক্রিটিকাল দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

“এত বড় কাজে নানা খুঁটিনাটি থাকে, এতে ভুল-ভাল কিছুটা হবেই। ননী আর কনু তো সবসময়েই সজাগ। ওরা ম্যানেজমেন্টে কোথাও কোনও অসুবিধের গন্ধ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে শুধরে দেবার চেষ্টা করবে।“

একটু থেমে মোক্ষদা যেন সগর্বেই বললেন, “তুমি চিন্তা ক’রোনা আর বেশি বকাবকিও ক’রোনা বাপু । আমাদের বাচ্চারা আর সেই ছোট্টটি নেই, তার এখন ছেলেমানুষি ছেড়ে চিন্তাশীল – দায়িত্বশীল হয়ে গেছে। দেখো, ওরা ঠিক কাজটা সুন্দর করে সামলে দেবে।“

সব শুনে রাজেন্দ্রলালের মুখে যেন ছোট্ট হাসির রেখা ফুটে উঠল।

পাত্র-পাত্রী পরিচিতি: (১) রাজেন্দ্রলাল : রায়সাহেব রাজেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, (২) মোক্ষদা সুন্দরী: রাজেন্দ্রলালের পত্নী, (৩) খুকি:   রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর বড় মেয়ে, (৪)খোকা:  রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর বড় ছেলে, (৫) কনু: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর মেজ মেয়ে, (৬) পচু : রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর সেজ মেয়ে  (৭) ঘেটু:   রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর মেজ ছেলে, (৮) লাকি: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর সেজ ছেলে, (৯) ননী: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর চতুর্থ কন্যা, (১০) খোকন : রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর ছোট ছেলে,  (১১) ছবি : রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর পঞ্চম কন্যা, (১২) বীণা: রাজেন্দ্রলাল ও  মোক্ষদা সুন্দরীর ছোট মেয়ে

Prof. Sanjoy Bandopadhyay – Rrik’s father

Rajendralal and Mokshada Sundari at Rushai’s Wedding

I kept wondering what it would be like if Rajendralal and Mokshada Sundari were the chief advisors for their great-grandson’s wedding—standing tall and alert like the pillars of the Red Fort, overseeing everything. Perhaps they would begin by saying, “Khuki, these people don’t understand a thing. You look into it properly. Khokan’s grandson—what’s his name, Rushai?—you must first understand what he is like, what he prefers, how he feels about things.”

Watching the way the wedding preparations were unfolding, Mokshada Sundari would surely be astonished. “They know nothing of Barishal’s customs,” she would say. “We were married as children and still managed our little battles all the way till Class Four. But these grown-ups? They can’t manage a thing!”
Her face would flush with a strange mix of pride and embarrassment. “You know,” she might add, “I passed the scholarship exam and he failed. He pinched me so hard I bled! What’s the point of later pretending otherwise? Macmillan’s books, Ray Saheb… I know all of that too.”

To be honest, someone strong and dependable like Khoka would have been a great help. They seem to have forgotten him, and it hurts now and then. Still, Ghetu’s brilliant head will solve many problems, and if some sudden mess crops up, Lucky is always there to handle it.

Khokon is still quite young; it’s best not to put too much pressure on him. I know he’ll guide the cooks about what needs to go where, and if the little ones get too mischievous, he can pull out his basket of stories and calm them down in no time.
Alpana and decorations? Why worry—Chhobi is there, she’ll take care of it.
And Bina? She’ll surely sing a couple of sweet lines in the bridal chamber—“Phule phule ki katha…”

After catching her breath, Mokshada continued, “Konu and Noni are also Rushai’s grandmothers in a way—they too will want the ceremony to be beautiful. They should take up some important responsibilities as well.”

“In such a big event, there will always be a hundred little details. Mistakes will happen. But Noni and Konu are always alert. The moment they sense something is not right, they will leap in and try to fix it.”

She paused, then said proudly, “Don’t worry, and don’t scold them too much. Our children aren’t little anymore. They’ve left behind childishness and become thoughtful, responsible people. You’ll see—they will manage everything beautifully.”
Hearing all this, a faint smile appeared on Rajendralal’s lips.

Characters:

  1. Rajendralal – Rai-Saheb Rajendralal Bandyopadhyay, 2. Mokshada Sundari – Wife of Rajendralal, 3. Khuki – Eldest daughter, 4. Khoka – Eldest son, 5. Konu – Second daughter, 6. Pochu – Third daughter, 7. Ghetu – Second son, 8. Lucky – Third son, 9. Noni – Fourth daughter, 10. Khokon – Youngest son, 11. Chhobi – Fifth daughter, 12. Youngest daughter – Bina

দুম!!! চোখে ধুতরো ফুল, কানে তালা, হাত ফেটে চৌ-চিড়

দুম করে একটা বিশাল আওয়াজ! চোখে ধুতরো ফুল দেখছি, কানে কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছিনা, হাতের চামড়া ফেটে গ্যাছে—! পাপা, মানে আমার বাবা, পুজো করছিলেন, এক লাফে মেঝের আসন থেকে সোজা বারান্দায়, “কি হল, কি হল?”। বললেন, “এতো বড় আওয়াজ? আমি তো কানে কিছু শুনতে পাচ্ছিনা,  —“। তখনই নজর গেল বিছানার ওপর, ওখানে আমার বছর খানেকের ছোট্ট মেয়ে শোয়া। আমি কানে শুনতে পাচ্ছিনা, পাপা চেঁচামেচি করছে – সেও শুনছেনা, তাহলে মিমের কি হল? মিম আমার ছোট্ট মেয়ে; কানে কালা হয়ে গেল না তো! ও শুয়ে আছে কিন্তু তেমন কোনও আওয়াজ করছেনা। ডাকলাম, তেমন কোনও সাড়াও দিচ্ছেনা। আমরা সবাইই খুব ভয় পেয়ে গেলাম।

ঘটনাটা হয়েছিল আমার হঠাৎ মনে জেগে ওঠা বীর হবার আকাঙ্ক্ষায়। সেদিন দীপাবলী। আমাদের তিনতলার বারান্দায় তখনও গ্রিল ওপর অবধি ওঠেনি, ওটা উঠেছিল বেশ কয়েক বছর পর, সেও এক বিরাট ঘটনা। আমার ছেলের হনুমান বা বেড়াল ইন্সপায়ার্ড চেষ্টা আর ন-বছরের মিমের ভাইকে বাঁচিয়ে নেওয়া, আর নিচে জয়সওয়ালজী পরিবার মোটা বেডকভার নিয়ে দাঁড়ানো, লাফ দিলে ধরবে বলে। এই গল্প অন্য একদিন হবে।

আবার আমার বীর হবার কথায় আসি। দীপাবলীর দিন – চার-দিকে বাজি ফাটছে। আমার গিন্নির বাজি ফাটানোর খুব শখ, বিশেষ করে শব্দ-বাজি। বেশ কয়েকটা বড় বড় চকোলেট বোম কিনেছিলাম। হাতে ধরে বোমে আগুন ধরিয়ে না ফাটাতে পারলে তো ব্যাপারটা জমলই না। বোম জ্বালানোর নানা রকম প্রসেস আছে, আপনারা সবাই জানেন। প্রথম হচ্ছে,  দূর থেকে আগুন না ধরিয়েই তিনবার দৌড়ে পালিয়ে সাকসেসফুল হওয়ার চেস্টা বা সলতের ওপর কাগজ লাগিয়ে ভয়ে ভয়ে জ্বালান, আর তৃতীয়টি হচ্ছে বীরের মতো হাতে ধরে জ্বলানো – তারপর সলতে তে আগুন লাগলে অনায়াসে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। ওই শেষেরটা করতে গিয়েই আমার যত বিপত্তি। সলতে আগুন লাগতেই ঝপ করে জ্বলে গিয়ে আমার হাতেই ফেটে গেল। বাকি তো আগেই বলেছি।

সে রাত্রে আর হলোনা, পরের দিন পৌঁছুলাম আমাদের ডাক্তার মিশ্রজীর চেম্বার। সে যাত্রা আমরা সবাই-ই মোটামুটি বেঁচে গেলাম, মিম তো পরের দিনই ফিট, আমার হাত সারতে সপ্তাহ খানেক সময় নাগল। বাকি, শুধু পাপারই মনে হল যে আমার বাজির আওয়াজেই ওনার কানটা বিগড়েছে। এটা কিছুতেই বোঝানো গেলনা যে ওটা সলতের দোষ, অত তাড়াতাড়ি বারুদে না পৌঁছুলেই হচ্ছিলনা? বোমটারই বা অত ভয়ঙ্কর ভাবে ফাটার কি দরকার ছিল। ড্যাম্প খেয়ে বাবুরাম সাপুড়ের সাপের মতো ফুস ও তো করলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হোত। যত দোষ সব আমার ঘাড়েই পড়ে, ভাবছি এপিঠ-ওপিঠ করে নাম বদলে ‘নন্দ ঘোষ’ হয়ে যাব।   

কাজল আর গরম – সাথে মিয়াঁ-কী-সারঙ

Click for Hindi version || Click for English version

যাদবপুরের ২০ বিধান পল্লীর বাসাবাড়িতে ৬০, ৭০, ও ৮০র দশক মিলিয়ে আমরা বহু-বছর কাটিয়েছি। সে বাড়ীর গল্প আরেকদিন বলব, আজ অন্য একটা গল্প বলি। এটা ৭০ দশকের মাঝামাঝির কথা, আমরা ওই বাড়ীতেই থাকি। বিধান পল্লীর ওই পাড়াতে আমার বন্ধুদের মধ্যে চার-জনের সাথেই বেশী সময় কাটত। আশপাশের মানুষজন, বিশেষ করে পাপা [আমার বাবা] অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন যে এদের এত কি গ্যাজানোর থাকে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেঁজিয়েও স্টক শেষ হয়না। এখন বুড়ো হয়ে নিজেকে দিয়েই ব্যাপারটা বুঝতে পারি যে এটা চিরকালের সত্য; মানে, বয়সে বড় হলেই ছোটদের চাপে ফেলার নানা চক্রান্ত মাথার মধ্যে কিলবিল করে।

তখন গরমের ছুটি। পড়াশুনোর জন্য আমার সেতার বাজনা কখনোই চাপে পড়েনি, কারণটা খুব সোজা, পড়াশুনোর কথা ভাবলেই গা জ্বালা করত, কেউ পড়াশুনো করতে বললেও করতাম না। সেতার বাজাতে যে সবসময়ে দারুণ লাগত তা নয়, তবুও পড়াশুনোর থেকে অনেক ভালো। আর রবিশঙ্কর কে দেখে খুব উৎসাহিত হতাম, কিন্তু ওনাকে যে রবিশঙ্করজী, পণ্ডিত রবিশঙ্কর বা কম করে পন্ডিতজী বলে সম্বোধন করা উচিত সেই ভদ্রতাটুকুও জানতাম না। সে সময় আমার আশপাশের বাঙালী মানুষ “আহা, রবিশঙ্কর বা বিলায়েত বা নিখিল কি ভালো বাজাল” এ ভাবেই নাম-প্রয়োগ করত। ওস্তাদজী একদিন আমাকে সুন্দর করে ঝেড়ে পালিশ করে দিলেন, “এই ছোড়া, ওনাকে পণ্ডিত রবিশঙ্কর বা রবিশঙ্করজী বলবে, শুধু নাম নিয়ে নয়।“ সেদিন থেকে জঙ্গলী থেকে সভ্যতার কিছুটা কাছাকাছি এলাম।   

কিন্তু যে গল্পটা বলার জন্যে লেখাটা শুরু করেছিলাম তার থেকে বার-বার দুরে চলে যাচ্ছি। আজকের গল্প কাজলকে নিয়ে। যে চার বন্ধুর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তার হচ্ছে শোভন, কাজল, রবি, আর আমি। চার জন চার প্রান্তের, এঁদের সব কিছুই আলাদা, শুধু আড্ডা মারাটা সবারই পছন্দ ছিল। এদের কেউ ছিল ধর্মেন্দরের ভক্ত, কেউ মা কালীর, কাজল ছিল অভক্ত, আর আমি না ঝোলে না অম্বলে – মানে ভক্তাভক্ত।  ভক্তাভক্ত শব্দটা কি বুঝিয়ে বলতে হবে? ওটা সুবিধেবাদী পার্টির মেম্বার, যখন যেমন তখন তেমন, যখন সুস্বাদু প্রসাদ নাকের সামনে ঝুলছে তখন ভক্ত হয়ে খুড়োর কল লম্বা করে সানন্দে চেটেপুটে খাওয়া, আর সেটা না হলে ও নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই।

বন্ধূরা কেউই খুব সিরিয়াসলি গান-বাজনা শেখা-করা করতনা, কিন্তু আমাকে সাপোর্ট করত। এদের মধ্যে শোভনের মা ও বাবা গান-বাজনা করতেন, ওর মা বিদুষী দীপ্তি চন্দ খুব ভালো সেতার বাজাতেন। বৌদি কে নিয়ে কখনও লেখার ইচ্ছে আছে। শোভনের মা কে বৌদি ডাকতাম আর শোভনের সাথে পরিচয়ের অনেক আগের থেকেই ওনার ভালোবাসা পেয়েছি।

সেদিন খুব গরম পড়েছিল, পিচের রাস্তায় পা ছোঁয়ানো যাচ্ছেনা। সে সময়ে খালি পায়ে চলার অভ্যেসটা একেবারে চলে যায়নি। আমার একটা বাজনার ঘর ছিল, সে ঘরের দেয়াল কিছুটা মোটা থাকার জন্য অন্য পাতলা ছাদের ঘরের থেকে কিছুটা ঠান্ডা থাকত। দুপুর দুটো, ঘরের জানলাগুলো বন্ধ করে দিলাম যাতে সেতারের আওয়াজ ভালো শোনা যায়, ঘর অন্ধকার, শুধু অল্প ফাঁটা জানালার ফোকরগুলো দিয়ে অল্প অল্প আলো ঢুকছে তাতে একটা অদ্ভুত আমেজ তৈরি হয়েছে। ঘরে একটা ঘরঘরে টেবিল ফ্যান ছিল, সেটা বন্ধ; আমি মিয়াঁ-কী-সারং নিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ বাজাতে বাজাতে মনে হল দেখি তো কাজল কি করছে, এক-আধজন শ্রোতা থাকলে বাজনাটা জমে ভালো। টুক করে চলে গেলাম কাজলের বাড়ী, তিরিশ সেকেন্ডের পথ। পৌঁছে দেখলাম কাজল মেঝেতে শুয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে উঠে বসল। আমি বললাম, “কি রে ঘুমোচ্ছিস?” এই প্রশ্নতে ও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল, “শালা, এই গরমে কেউ ঘুমোতে পারে?” দেখলাম এসবেস্টসের ছাতের নিচে পাখাটা বেশ জোরেই ঘুরছে, কিন্তু তাতে ঠান্ডা করার থেকে গরমই যেন বেশি হচ্ছে। বললাম,”আমি সেতার নিয়ে বসেছি, তুই কি আসবি?”  সামনেই হাওয়াই চপ্পল রাখা ছিল, ওটা পায়ে গলিয়েই আমার সাথে বেরিয়ে পড়ল।

ঘরের মধ্যে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “সব দরজা-জানালা বন্ধ করে রেখেছিস?” আমার সুর-পালিয়ে যাবার লজিক ওর যুক্তিপূর্ণ মনে হল আর কোনও কথা না বাড়িয়ে শুনতে বসে গেল। আমি তো জমিয়ে আলাপ, তার পর বিলম্বিত জোড়, গমক জোড় বাজাচ্ছি। প্রায় ঘণ্টা খানেক হয়ে গিয়েছে; দেখলাম আমার মতন ও ও কুল কুল করে ঘামছে। আস্তে আস্তে আমাকে বলল, “বেশ বাজাচ্ছিস, বাজিয়ে যা, আমি এক্ষুনি একটু ঘুরে আসছি।“ আমি তার পর, নানা অঙ্গের গমক জোড়, নানা রং বেরঙের বোল তান, একহারা তান, উল্টো ঝালা, ঠোক ঝালা, সোজা ঝালা সব বাজিয়ে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, কিন্তু কাজল তো ফিরলোনা! আমি ভাবলাম, কি হলো? সেতার রেখে, চপ্পল পায়ে গলিয়ে ওর বাড়ী গিয়ে হাজির হলাম, দেখলাম মাঝেত ওই গরমের মধ্যে ভোস ভোস করে ঘুমোচ্ছে।

বুঝলাম ওই অসহ্য গরম আর আমার দরজা জানলা বন্ধ গুমোট ঘরটা কাজে দিয়েছে।

काजल और गर्मी साथ में मियाँ-की-सारंग 

जादवपुर के 20 विधान पोललि के मकान में हमने 60, 70 और 80 के दशक मिलाकर कई साल बिताए हैं। उस घर की कहानी किसी और दिन कहूँगा, आज एक अलग कहानी सुनाता हूँ। यह 70 के दशक के बीच की बात है, हम उसी घर में रहते थे। विधान पल्ली के उस मोहल्ले में मेरे दोस्तों में चार के साथ ही ज़्यादा समय कटता था। आस-पड़ोस के लोग, ख़ासकर पापा [मेरे पिता] तंग हो जाते थे कि इनके पास इतना क्या गपशप है जो घंटों गपियाने के बाद भी ख़त्म नहीं होता। अब बूढ़ा होकर खुद को देखकर समझ पाता हूँ कि यह तो चिरंतन सत्य है; मतलब, उम्र बढ़ते ही छोटे लोगों पर दबाव डालने के तरह-तरह के षड्यंत्र दिमाग़ में कुलबुलाने लगते हैं।

उस समय गर्मियों की छुट्टियाँ थीं। पढ़ाई की वजह से मेरा सितार बजाना कभी दबा नहीं, वजह बहुत सीधी थी—पढ़ाई का नाम सुनते ही तन-बदन में जलन होती, कोई कहता भी तो मैं पढ़ाई नहीं करता। सितार बजाना हर समय बहुत अच्छा लगता था ऐसा नहीं, फिर भी पढ़ाई से कहीं बेहतर था। और रविशंकर को देखकर बहुत प्रेरणा मिलती थी, लेकिन उन्हें “रविशंकरजी,” “पंडित रविशंकर” या कम से कम “पंडितजी” कहना चाहिए यह शिष्टाचार मुझे पता नहीं था। उस समय मेरे आस-पास के बंगाली लोग बस ऐसे ही कहते—“आहा, रविशंकर या विलायत या निखिल क्या अच्छा बजाया।” एक दिन उस्तादजी ने मुझे अच्छे से डाँट-फटकारकर कह दिया, “अरे छोकरा, उन्हें पंडित रविशंकर या रविशंकरजी कहो, केवल नाम लेकर नहीं।” उस दिन से जंगलीपन से थोड़ी-सी सभ्यता की ओर बढ़ा।

लेकिन जो कहानी कहने बैठा था, उससे बार-बार भटक जा रहा हूँ। आज की कहानी काजल को लेकर है। जिन चार दोस्तों का ज़िक्र करके शुरू किया था वे थे—शोभन, काजल, रवि और मैं। चारों अलग-अलग, सब कुछ अलग, केवल अड्डेबाज़ी सबको पसंद थी। कोई धर्मेन्द्र का भक्त था, कोई माँ काली का, काजल था अभक्त, और मैं था “भक्ताभक्त”—मतलब, न इधर न उधर। भक्ताभक्त का मतलब समझाना पड़ेगा क्या? वह सुविधाभोगी पार्टी का सदस्य—जब जैसा, तब वैसा। जब स्वादिष्ट प्रसाद सामने लटक रहा हो तब भक्त बनकर खूब चटखारे से खाना, और जब न हो तो कोई परवाह नहीं।

दोस्तों में कोई भी बहुत गंभीरता से गाना-बजाना सीखता नहीं था, लेकिन मुझे सपोर्ट करते थे। इनमें शोभन की माँ और पिता संगीत से जुड़े थे। उसकी माँ, विदूषी दीप्ति चंद, बहुत अच्छा सितार बजाती थीं। बौदी के बारे में कभी लिखने का मन है। शोभन की माँ को हम बौदी कहते थे और शोभन से जान-पहचान से बहुत पहले ही मुझे उनका स्नेह मिला था।

उस दिन बहुत गर्मी थी, डामर की सड़क पर पैर रखना मुश्किल। उस समय नंगे पाँव चलने की आदत अभी पूरी तरह गई नहीं थी। मेरा एक बजाने का कमरा था, जिसकी दीवारें थोड़ी मोटी थीं, इसलिए पतली दीवारों वाले कमरों से थोड़ा ठंडा रहता था। दोपहर के दो बजे, मैंने खिड़कियाँ बंद कर दीं ताकि सितार की आवाज़ साफ़ सुने। कमरा अंधेरा, बस झिरीदार खिड़की से हल्की रोशनी आ रही थी, जिससे अजीब-सा वातावरण बन गया था। कमरे में एक पुराना टेबल-फैन था, वह भी बंद। मैं मियाँ-की-सरंग लेकर बैठ गया। कुछ देर बजाने के बाद सोचा—देखूँ काजल क्या कर रहा है, एक-दो श्रोता हों तो बजाने का मज़ा आता है। फटाफट काजल के घर गया, तीस सेकंड की दूरी। पहुँचा तो देखा काजल ज़मीन पर लेटा सोने की कोशिश कर रहा है। मुझे देखकर उठ बैठा। मैंने पूछा, “क्या रे, सो रहा है?” इस सवाल पर वह झल्लाकर बोला, “साला, इस गर्मी में कोई सो सकता है?” देखा, ऐसबेस्टस की छत के नीचे पंखा ज़ोर से चल रहा था, लेकिन उससे ठंडक से ज़्यादा गर्मी लग रही थी। मैंने कहा, “मैं सितार लेकर बैठा हूँ, तू आएगा क्या?” सामने ही हवाई चप्पल रखी थी, वह पहनकर मेरे साथ निकल पड़ा।

कमरे में घुसकर उसने पूछा, “सभी दरवाज़े-खिड़कियाँ बंद कर रखी हैं?” मेरे “सुर भाग जाएगा” वाले तर्क को उसने तर्कसंगत पाया और बिना और सवाल किए सुनने बैठ गया। मैं तो जमकर आलाप, फिर विलंबित झोर, गमक झोर बजाने लगा। लगभग एक घंटा हो गया; देखा कि मेरी तरह वह भी पसीने से तर-बतर हो रहा है। धीरे से बोला, “अच्छा बजा रहा है, बजा, मैं अभी थोड़ी देर घूमकर आता हूँ।” फिर मैं अलग-अलग अंगों का गमक झोर, रंग-बिरंगे बोल-तान, एकहरा तान, उल्टा झाला, ठोक झाला, सीधा झाला—सब बजाता रहा लगभग 1 घंटा 40 मिनट। लेकिन काजल तो लौटा ही नहीं! मैंने सोचा, क्या हुआ? सितार रखकर, चप्पल पहनकर उसके घर पहुँचा। देखा, उसी तपती गर्मी में वह जोर-जोर से खर्राटे लेकर सो रहा है।

तब समझा कि उस असह्य गर्मी और मेरे दरवाज़ा-खिड़की बंद घुटनभरे कमरे ने अपना काम कर दिया था।

Kajal and the Heat – with Miyan-ki-Sarang

In the house at 20 Bidhan Palli, Jadavpur, we spent many years across the 1960s, ’70s, and ’80s. The story of that house I will tell another day; today, let me share a different one. This goes back to the mid-1970s, when we were still living there. Among my friends in that neighborhood, there were four with whom I spent most of my time. The people around, especially Papa [my father], would be exasperated—“What on earth do these boys chatter about for hours on end, and still they don’t run out of stock?” Now that I have grown old, I understand from within myself that this is an eternal truth; meaning, as soon as one grows older, conspiracies to subdue the younger ones start wriggling in the mind.

It was summer vacation then. My sitar practice was never suppressed for the sake of studies—simply because even the thought of studies made my whole being burn. If someone told me to study, I simply wouldn’t. Playing the sitar didn’t always feel thrilling, but still it was far better than studies. I was greatly inspired seeing Ravi Shankar, but I didn’t even know the courtesy of addressing him as Ravi Shankar-ji, Pandit Ravi Shankar, or at least Pandit-ji. The Bengalis around me would just say—“Ah, what wonderful playing by Ravi Shankar, or Vilayat, or Nikhil.” One day Ustad-ji polished me off thoroughly, saying, “Hey boy, call him Pandit Ravi Shankar or Ravi Shankar-ji, not just by name.” From that day, I came a little closer to civilization from wildness.

But I keep straying away from the story I sat down to tell. Today’s story is about Kajol. The four friends I mentioned at the beginning were Shovon, Kajol, Ravi, and me. Four people from four different ends—everything about them was different, except that all loved spending time in adda (casual banter). One was a devotee of Dharmendra, another of Ma Kali, Kajol was a non-believer, and I was “bhakt-abhakt”—neither here nor there. Should I explain that word? It meant a member of the opportunist party: when the occasion demanded, one turned into a devotee—say, when delicious prasad dangled before the nose, then stretching the uncle’s pulley, happily licking it clean; and otherwise, no concern at all.

None of the friends pursued music seriously, but they supported me. Among them, Shovon’s mother and father were into music. His mother, Vidushi Deepti Chanda, played the sitar very well. I hope to write about Boudi sometime. We used to call Shovon’s mother Boudi, and even long before I knew Shovon, I had received her affection.

That day it was extremely hot—you could not set your foot on the tar road. At that time, the habit of walking barefoot hadn’t entirely disappeared. I had a music room of my own, with walls a little thicker than the other thin-walled rooms, so it stayed slightly cooler. At two in the afternoon, I shut the windows so the sitar sound would be heard well. The room was dark, only slivers of light entered through the narrow cracks of the closed shutters, creating a strange ambience. There was an old table fan, switched off. I sat down with Miyan-ki-Sarang. After playing for a while, I thought—let me see what Kajol is doing; music feels livelier with at least one listener. I dashed over to Kajol’s house, just thirty seconds away. I found him lying on the floor, trying to sleep. Seeing me, he sat up. I asked, “Hey, sleeping?” At that question, he flared up: “Damn it, in this heat can anyone sleep?” I noticed the fan under the asbestos roof was spinning quite hard, yet it seemed to produce more heat than coolness. I said, “I’ve sat down with my sitar, want to come?” His slippers were right there; he slipped them on and came with me.

Entering my room, he asked, “You’ve shut all the doors and windows?” My logic that “the sound would escape” seemed convincing enough to him, so without further debate he sat to listen. I started with a proper alap, then vilambit jod, gamak jod. An hour passed; I saw that like me, he too was dripping with sweat. Slowly he said, “Playing well, keep at it, I’ll just step out for a bit.” Then I went on—gamak jod in various styles, colorful bol-taans, ekhara taans, reverse jhala, thok jhala, straight jhala—playing for nearly 1 hour 40 minutes. But Kajol never returned! I wondered, what happened? Leaving the sitar aside, slipping on my sandals, I went to his house. There he was, in the middle of that unbearable heat, sleeping soundly with loud snores.

I realized then—the suffocating hot room with closed doors and windows had done its job.

আমার ভুড়ি ও কুট্টিদিদি

কুট্টিদিদি একজন সোজা-সরল-নিদাগ মানুষ। নিজের বানানো ছোট্ট জায়গায় নানা রঙের অনুভূতি নিয়ে বাঁচেন। প্রায়ই ওর কলমে নানা জানা-অজানা অনভূতি ধরা পড়ে যায়, মানুষকে সুযোগ করে দেয় ওকেই অন্য চোখে দেখার। আমি সাহিত্য ভালবাসি বললে সেটা সঠিক হবে না, আমার সাহিত্য নিয়ে লেখা-পড়া শুরু হয়েই ফস করে শেষ হয়ে যায়। তবুও কখনও কখনও কুট্টিদিদির কোনকোন লেখা পড়ে মনে হয়, “এ তো বেশ! লেখাটা যেন টুক করে পুরো মনটা দখল করে দুম করে রাজত্ব শুরু করে দিল।“   

বুঝেই উঠতে পারছিলাম না আমার পেটটা ক্রমাগত এত বড় হয়ে যাচ্ছে কেন।  একবার ভাবলাম বাচ্চা হবে, পরে ভাবলাম, না না, ওসব পুরুষ-মানুষের পেটের ভাগ্যে নেই। দু-একজন বলল, ওটা  গেলাসে-গেলাসে মদ, বাক্স-বাক্স গঙ্গুরামের কাঁচা-গোল্লা, আর আরসালানের এগ-রোল মিশে কেমিক্যাল রিয়াকশনে  হচ্ছে। মদ ছেড়ে দিলাম, খাওয়াও প্রায় ছেড়ে দেখলাম, হাঁটা-হাঁটি শুরু করলাম; কিসুতেই কিস্সু  না, পেটের নো নড়ন চড়ন, যেমন-তেমনই ঠ্যাটার মতো দাঁড়িয়ে আছে।

যাক, এতদিন পর কারণটার নাগাল পেয়ে খপ করে ধরে ফেলেছি। এখন আমি পাক্কা জানি ওটা তোর দেওয়া গ্যাসের ফল। এটা কিন্তু এক্কেবারে সন্দেহাতীত – কল্পনাতীত। ঠিক ধরেছি না? তুইই বল।    

একগুচ্ছ দুষ্টুমি-চিরকুট

তিনদিন হলো ছোড়দির চোখের ছানি কেটেছে। নতুন করে স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার মহা-সুখ। এর মধ্যেই কিছুটা জ্বালানোর জন্যে দু-চারটে ডিজিটাল চিরকুট পাঠিয়ে দিলাম। বিশ্বাস করে বললাম, কথাটা কিন্তু আপনারা আবার ফাঁস করে দেবেননা।  

১৮ জুলাই। ২০২৫

চিরকুট – ১

তোর ছোট্ট চিরকুট পেয়েই বুঝলাম তুই চোখ-ভরে আবার দেখতে পাচ্ছিস। ভাবলাম খবরটা গুরুদেবকে দিয়ে দিই। উত্তরে উনি তোকেই সোজাসুজি লিখলেন;


“তোমার সংবাদ পেয়ে হৃদয় জুড়ে প্রশান্তি নামল—জানলাম, তোমার দৃষ্টির জগৎ আবার উন্মোচিত হয়েছে। চিকিৎসকের কৃতিত্ব সত্যই প্রশংসনীয়।
তবে বলো তো, তাঁকে পুনরায় দেখে তোমার অন্তরে কেমন অনুভব জাগে? অপারেশনের পূর্বে যে প্রতিচ্ছবি ছিল, তার তুলনায় আজকের রূপ কতখানি পরিবর্তিত?
তিনি কি পূর্বেই ছিলেন সৌন্দর্যের আধার, না কি অপারেশনের পর নতুন এক দীপ্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন?”

চিরকুট – ২

তোর অপারেশনের খবরটা চাটুজ্জে-বাবুকে [বঙ্কিম] জানিয়েছিলাম। উনিও তোকে দু-কলম লিখে পাঠিয়েছেন।

“জানিতে পারিলাম—আপনার চক্ষু পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে। ইহা কেবল শল্যচিকিৎসার সার্থকতা নহে; ইহা এক ঈশ্বরসঞ্জাত অনুগ্রহ, যাহা মানবশরীরের সীমা ভেদ করিয়া আত্মার আলয় স্পর্শ করে।
যাহাকে আপনি পুনরায় দেখিতে পাইতেছেন, তাহার প্রতিমূর্তি কি পূর্বের ন্যায় কেবলই রূপসৌন্দর্যের বাহ্যপ্রকাশ, না কি, ঈশ্বরের দর্শনে অন্তর্জগতে বিকশিত হইয়াছে এক নূতন উপলব্ধি—যে রূপ অদৃশ্য, কিন্তু অনির্বচনীয়?
মানুষটির মুখচ্ছবিতে কি ঈশ্বরের সৃষ্টির এক অপূর্ব শোভার আভাস পাইতেছেন—যাহা পূর্বে ছিল অস্পষ্ট, কিন্তু আজ যেন দৃষ্টি নয়, হৃদয়ের সহিত প্রত্যক্ষ?”

চিরকুট – ৩

ছানি অপসারণ ও পুনর্লব্ধ দৃষ্টির দুঃখ

যখন চশমা পরিধান করিয়াও স্পষ্ট দেখিতে পাইতাম না তার সুখ তখন অবধারনের ক্ষমতা ছিলনা; ছানি অপসারণ উপরান্ত তার স্পষ্ট অবলোকন হইল।বুঝিলাম দৃষ্টি-লাভের দুষ্পরিণাম। যখন কম দেখিতে পারিতাম তখন আশপাশের কুৎসিত আকৃতি তেমন দৃষ্টিগোচর হইতনা, মনের রঙে সুশোভিত হইয়া মনের আয়নায় ধরা দিত। এখন সে সুখের দিন গিয়াছে, বাকি জীবন বোধ করি এই যন্ত্রণা নিয়াই চলিতে হইবে।  

চিরকুট – ৪

তোর ছানি অপারেশনের খবর জেনে মাইকেল তো অদ্ভুত লিখলেন, লিখলেন ছানি অপসারণের বিপক্ষে; যেমন স্বভাব।    

দৃষ্টির পুনর্জাগরণে বিমূঢ় হৃদয়বেদনা

হে চিরন্তন প্রকৃতি! এক সময় ছিল, যবে দৃষ্টির দীনতা মোরে করুণাভরে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। চশমার কাচের অন্তরাল দিয়া জগৎ যাহা দেখা দিত, তাহা এক প্রকার মায়ার আবরণে আচ্ছাদিত স্বপ্নলোকের ন্যায় মনে হইত। তাহা ছিল অস্পষ্ট, অথচ মোহনীয়—চিত্ররূপিনী বাস্তবতা নহে, বরং হৃদয়ের রঙে রঞ্জিত এক কল্পলোক।

কিন্তু বিধি হায়! সেই করুণা অপসারিত হইল, যখন চিকিৎসার কুশল স্পর্শে ছানির অন্তরাল অপনোদিত হইয়া, নির্মম জগতের নিরাভরণ চেহারা প্রকাশ পাইল। দৃষ্টি হইল তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট, নির্মোহ।

হায়! ইহাই কি কাঙ্খিত?

এতদিন যাহা ছিল বিমূর্ত, তাহা হঠাৎ হইয়া উঠিল রূঢ় বাস্তব। চারিপাশ—যাহা একদিন মুগ্ধতার ছায়াপটে স্নিগ্ধ ও কোমল দেখাইত, আজ তাহারা উদ্ভট, বিকৃত, কর্কশ চেহারায় মোর হৃদয় বিদীর্ণ করে। পূর্বে যাহা অন্তরে ফুলের মালা রচিয়া দিত, আজ তাহাই করিল কণ্টকের আঘাত।

এখন, এই জীবনপ্রান্তে, আমি বাধ্য হইয়াছি সহিতে স্পষ্টতার শাস্তি। আর রঙ্গিন কল্পনার দিন নাই। রইল শুধু উজ্জ্বল অথচ বিষণ্ন এক জগত—যাহার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন চিৎকার করিয়া বলে, “স্বপ্ন নহি, আমি বাস্তব!” এবং সেই বাস্তবই আজ মোর শাস্তি, মোর তপস্যা, মোর যন্ত্রণা।

চিরকুট – ৫

ছানি-অপসারণের বিপক্ষে  মাইকেল আবার লিখলেন —

দৃষ্টির পুনর্জাগরণে বিমূঢ় হৃদয়বেদনা

হে প্রাচীন ধরণী! হে চিরজ্যোতিষ্মতী!
শ্রাবণের মেঘমালা যেমন ঢাকে দিবাকর,
তদ্রূপ মোর দৃষ্টি ছিল নিভৃত, স্নিগ্ধ, সংকীর্ণ,
স্বপ্ন-রেখা-রঞ্জিত, মনের বর্ণে মোহন কর।

চশমার কাঁচে ঢাকা বিশ্ব ছিল ছায়াপথ,
না ছিল কণ্টক, না ছিল বিক্ষোভের কর্কশতা।
অলীক ললাটে আঁকা রঙিন কল্পলোক,
রূপ নয়, রস নয়—প্রেমপুট রচিত ব্যথা।

কিন্তু হায়, অনিবার্য নিয়তির করাঘাতে,
চিকিৎসার তীর খচিত অণু-যন্ত্রের ছোঁয়ায়,
যখন ছানি নামক মরীচিকা করিল পলায়ন,
দেখিলাম জগত—নগ্ন, নির্মম, নৃশংস ছায়া।

দৃষ্টি হইল তীক্ষ্ণ, বলিয়াছে—“দেখ হে মানুষ!”
অতঃপর রহিল না স্বপ্নলোকের মৌন কুসুম,
যাহা ছিল কুৎসিত, হইল আরও কদর্য,
রূপ রহিল না, রহিল কেবল জ্বালাময় বিষণ্নতা।

যাহা ছিল অন্তঃলোকে অলঙ্কাররূপে সজ্জিত,
আজ তাহা দংশে মোর হৃদয়—রক্ত-নিসৃত।
যাহা ছিল কুসুমিত মালা, গন্ধ-মাতাল,
তাহাই হইল কাঁটা—চৈতন্যে বিষবৎ কাল।

হে করুণ বাস্তব! তুমি কি পরিত্রাতা, না যমদূত?
তোমার মুখশ্রীতে দীপ্তি নাই, কেবল দন্তরশ্মি।
দেখা পাই—তব রেখা, তব গঠন, তব ক্ষুদ্রতা,
কিন্তু নাই অনুভবের গীত, নাই প্রেমের শ্রী।

এই তপস্যা, এই দহন, এই জীবনের অভিশাপ,
স্পষ্টতার বিষপাত্র পান করিতেছি বিনা দ্বিধায়।
রহিল না আর আবরণ, রহিল না আঁখিপাতের কল্পনা,
রহিল শুধু বেদনায় দীপ্ত এক নির্মোহ, তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনা।

আজ মোর নিঃশেষ দৃষ্টি—দণ্ডবৎ সত্যের প্রতি,
যেখানে কল্পনার রমণী বিলীন—সুন্দরী মৃত।
উজ্জ্বল এই জগৎ, হে বন্ধু, জ্বালা দিয়া জাগায়,
চিৎকার করিয়া বলে—“আমি স্বপ্ন নহি, আমি চির সত্য!”

সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৽ কলকাতা ৽ ২১ জুলাই, ২০২৫

খরগোশ আর দন-দনা-দন

“আমরা খরগোশ দলে দলে

বাস করি ওই গাছের তলে

করাইশুটি আর কপি ক্ষেতে

লুটোপুটি যাই সবাই মিলে।“  

ছড়াটা শুনেছেন? শুনলে ভালো, না শুনলে আরও ভালো; ওই ছড়াটাই এক বিকেলে আমার জীবনে অনেক দুঃখ এনে দিয়েছিল। গল্পটা বলি শুনুন।

তখন আমি বেড়ে-টেড়ে সাত বছরের ধেরে হয়ে গেছি। হীরেন রায় আমাকে একটা ছোট্ট সেতার বানিয়ে দিলেন। আমার তো খুশি আর ধরে না। পাপা, সা রে গা মা, সারেগা, রেগামা এসব শেখাতে শুরু করলেন। শুরু শুরু তে তো বেশ লাগল, নতুন চকচকে সেতার, সেটা আবার আমি বাজাচ্ছি! এতদিন পাপাকেই বাজাতে দেখেছি, কিন্তু এখন আমার হাতেও সেতার। সমস্যা দু-এক দিন পরের থেকে শুরু হল, আঙ্গুলে এত ব্যথা লাগে, এ তো বড় মুশকিল। অতএব বাজানো কমে গেল। পাপা দেখলেন ছেলে তো বাজাচ্ছেনা। তখন উনি একটা উপায় কষলেন। উনি ভাবলেন, ছেলেকে যদি কোনও মজার গান বাজানো শেখানো যায় তাহলে ইন্টারেস্ট বাড়বে। বিপত্তির শুরু এখানেই। খরগোশ ভালো, খরগোশের ছড়া ভাল, খরগোশের গান ভালো, খরগোশের গান সেতারে ভালো, কিন্তু তাতে যদি ছাল-চামড়া উঠে যায় তাহলে খুব মুশকিল।

সেতার পেয়ে পাড়ার বন্ধুদের মাঝে একটু ফাঁট দেখানোর সুযোগ পেয়ে গেলাম। সুযোগ পেলে কে না ছাড়ে, বলুন? বন্ধুদের বললাম, আমি তো সেতার বাজাই, ওরা তো খুব আগ্রহী হয়ে পড়ল, “তাহলে, শোনা একদিন”। আমি তো বিপদেই পড়ে গেলাম। শোনাবো কি, ওই শুধু সারেগামা? বন্ধুদের বললাম, “শোনাব, শোনাব।“ এর কিছুদিন পরই ওই “খরগোশ”। আমার যা বাজানোর এলেম তাতে ওই খরগোশেই আমি মোটামুটি কুপোকাত। যাই হোক, কিছুদিন পর খরগোশ-করাইশুটি নিয়ে আমার অল্প-স্বল্প লুটোপুটি শুরু হল। মা’কে চুপি-চুপি বললাম বন্ধুরা বাজনা শুনতে চাইছে। সময় কেটে যাচ্ছে কিন্তু বাজনা শোনান আর হচ্ছেনা। আমি জানি ফট করে বন্ধুদের  বাজনা শোনাতে ডাকলে পাপা রেগে বোম হয়ে যেতে পারেন। আর পাপা রেগে গেলে কপালে কি আছে বলা মুশকিল।

একদিন সাহস করে বন্ধুদের ডেকেই ফেললাম, বললাম অমুকদিন চলে আয়। মা’কেও বললাম বন্ধুদের ডেকেছি। সেদিন ঘরের মেঝেতে তোশক তার ওপর পরিষ্কার সাদা চাদর বিছানো হল, মা আমাকে সাদা পাজামা – সাদা পাঞ্জাবী পরিয়ে তৈরি করে দিলেন। আমি তো রেডি, শুধু ঘড়ি দেখছি বন্ধুরা কখন আসবে।  

বন্ধুরা আসার পর সেতার নিয়ে বসে পড়লাম, সে যে কি ফিলিং; মনটা কখনও ফড়িং হয়ে নাচানাচি করছে কখনও বা উচ্চিংরে। তার পর শুরু হল “আমার খরগোশ”। খরগোশ তো গাছের তলায় বাস করে     আর  কপি ক্ষেতে লুটোপুটি খেয়ে টায়ার্ড হয়ে  গেল, তার পর? বন্ধুরা  বলল, “বেশ বেশ; আরও বাজা  আরও শুনব।” আমার তো স্টক শেষ, এখন কি করি? তারপর “সারেগামা”।  এই সারেগামা বাঁচিয়ে দিল, সবাই  বোর হয়ে চলে গেল, আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তখনও জানিনা যে সুনামি আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

বসার ঘরের পর্দাগুলো ফেলা ছিল তাই অন্য ঘরে কি হচ্ছে তার কোনও আইডিয়া ছিলনা। পর্দা সরিয়ে পাশের ঘরে পা দিয়েই দেখি যমরাজ, মনে পাপা। উনি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন, আর আমার হাইলি আর্টিস্টিক কাণ্ড-কারখানার আন্দাজ পেয়ে কোনরকম ডিসটার্ব না করে সোজা অন্য ঘরে ঢুকে গেছেন আর বোঝার চেষ্টা করছেন অন্য ঘরে কি হচ্ছে। আমি ঘরে ঢোকার পরই জিজ্ঞেস করলেন, “এত সাজ-গোজা, কি ব্যাপার?” বললাম বন্ধুর এসছিল, সেতার বাজালাম। তার পরই শুরু দন-দনা-দন, “তিনদিন সেতার শিখে আর্টিস্ট হয়ে গ্যাছো?” আবার দন-দনা-দন, “বাজনা শুরুই হলোনা আর বন্ধু ডেকে বাজনা শোনান হচ্ছে?” দন-দনা-দন। একটা বাক্য তারপরই দন-দনা-দন, দ্বিতীয় বাক্য আবার দন-দনা-দন, এরকম কিছুক্ষণ চলল। তারপর বোধহয় হাতে  ব্যথা পেয়ে গেলেন আর সুনামি থামল।

চুপিচুপি একটা কথা আপনাদের বলে দিই কাউকে প্লিজ বলবেন না; মার খেতে খেতে আমি কিছু ডিফেন্স টেকনিক আবিষ্কার করেছিলাম, তাতে আমার ব্যথা কম লাগতো আর যে মারছে সে কখনও কখনও ব্যথা পেয়ে যেত।

সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৽ কলকাতা ৽ ১৬ জুলাই ২০২৫        

खरगोश और दन-दना-दन

“हम खरगोश, टोली बना
बैठें उस पेड़ की छाया तले।
मटर-गोभी के खेतों में
लोटपोट हो खेलें मिलजुल के।”

ये कविता सुनी है? अच्छा किया! और न सुनी हो, तो और भी अच्छा – क्योंकि यही कविता एक दिन मेरे जीवन में भारी दुख लेकर आई थी।
अब सुनिए पूरी कहानी।

तब मैं पूरे सात साल का हो चुका था। हिरेन राय ने मुझे एक छोटा-सा सितार बना दिया। खुशी से मेरा दिल बाग-बाग! पापा ने मुझे सिखाना शुरू किया – सा रे गा मा, सारेगामा, रेगामा…
शुरुआत में सब बहुत मजेदार लग रहा था – चमचमाता सितार, और वो भी मैं बजा रहा था! अब तक तो पापा को ही बजाते देखा था, और अब खुद के हाथ में सितार!

मगर कुछ ही दिन में गड़बड़ शुरू हो गई – उंगलियों में ऐसी दर्द होने लगी जैसे कोई कांटे चुभो रहा हो। सितार छूने का मन ही नहीं करता था। पापा ने देखा कि बेटा तो ढीला पड़ गया। उन्होंने एक उपाय निकाला – सोचा कि अगर किसी मजेदार गाने के ज़रिए सिखाऊं तो बच्चे का मन लगेगा। बस, यहीं से शुरू हुई मुसीबत! खरगोश ठीक, खरगोश की कविता ठीक, खरगोश का गाना ठीक, सितार पर ठीक, लेकिन अगर उसी से खाल छिल जाए, तो?

अब सितार मिला है तो मोहल्ले के दोस्तों के बीच थोड़ा रौब जमाने का मौका तो बनता है ना?
मैंने ऐलान कर दिया – “मैं सितार बजाता हूँ!” दोस्तों ने भी फौरन कहा – “तो कभी सुनाओ ना।” अब मैं फंस गया! सुनाऊं क्या? वो ही सा-रे-गा-मा? मैंने टालमटोल करते हुए कहा, “सुनाऊंगा, सुनाऊंगा।”

कुछ दिनों बाद आया वो “खरगोश”! जो थोड़ी-बहुत बजाने की कला थी, उसी खरगोश में सब गड़बड़ हो गई।
खैर, किसी तरह “खरगोश – मटर – गोभी” में थोड़ी बहुत लोटपोट कर ही ली।

मैंने माँ को धीरे से बताया कि दोस्त लोग मेरी बजाई सुनना चाहते हैं। समय बीत रहा था, पर कार्यक्रम आगे नहीं बढ़ रहा था। अब मुझे मालूम था कि अगर बिना बताए दोस्तों को बुला लूं और पापा को खबर हो जाए, तो समझिए भूकंप आ जाएगा। और जब पापा नाराज़ होते हैं, तो परिणाम अज्ञात और डरावना होता है।

फिर एक दिन हिम्मत जुटाकर दोस्तों को बुला ही लिया – “फलां दिन आ जाना!” माँ को भी बता दिया – “माँ, दोस्तों को बुलाया है।” उस दिन घर में उत्सव जैसा माहौल बन गया – बैठक में तोशक बिछा, उस पर सफेद चादर,
माँ ने मुझे सफेद पायजामा और कुरता पहना दिया – एकदम कलाकार बना दिया।

अब मैं तैयार बैठा – बस घड़ी देख रहा हूँ कि दोस्त कब आएंगे। दोस्त आए, और मैं सितार लेकर बैठ गया।
उस वक्त की फीलिंग! मन जैसे फुदकता टिड्डा, कभी उछलता, कभी डरता। फिर मैंने शुरू किया – “हम खरगोश टोली बना…” खरगोश गाना खत्म हुआ – मटर-गोभी खा-खा के थक गए खरगोश।
दोस्तों ने कहा – “बहुत अच्छा! और सुनाओ!”

अब मेरी तो पूरी तैयारी बस इतने पर थी। तो फिर मैंने सहारा लिया – “सा-रे-गा-मा”। बस वही मुझे बचा ले गया – दोस्त बोर होकर चले गए और मैं चैन की सांस ले पाया। तब तक मुझे अंदाजा नहीं था कि एक सूनामी मेरा इंतजार कर रही है।

बैठक के परदे गिरे हुए थे – इसलिए पता ही नहीं चला कि बगल के कमरे में क्या चल रहा था। जब परदा हटा और मैं उस कमरे में घुसा… सामने यमराज खड़े थे – यानी पापा। वो दफ्तर से जल्दी लौट आए थे, और मेरे महान कलात्मक करतब की भनक लगाकर बिना कोई हलचल किए, चुपचाप दूसरे कमरे में जा बैठे थे – सब सुन रहे थे।

मैं जैसे ही कमरे में घुसा, पापा बोले, “इतनी सज-धज क्यों? क्या बात है?” मैंने कहा – “दोस्त आए थे, सितार बजाया।” बस, फिर क्या था – शुरू हुआ दन-दना-दन! “तीन दिन सीखा और कलाकार बन गया?” – दन-दना-दन! “अभी ठीक से सुर पकड़ना नहीं आया, और दोस्तों को बजाकर सुना भी दिया?” – दन-दना-दन! हर वाक्य के बाद दन-दना-दन। दूसरा वाक्य – फिर दन-दना-दन। ये सिलसिला थोड़ी देर तक चला…
फिर शायद उनके हाथ दुखने लगे और तूफान रुका।

अब एक बात चुपचाप आपसे कहता हूँ – कृपया किसी को मत बताइएगा। मार खाते-खाते मैंने कुछ डिफेंस टेक्निक खोज लिए थे – जिनसे मुझे कम दर्द होता था, और मारने वाले को कभी-कभी ज्यादा हो जाता था! 

ভুল করে ঠিক

সন বোধ করি ১৯৫৬, আমার বয়েস বেড়ে বছর দুয়েক হল। আমরা তখন রসা রোডের ভাড়া-বাড়িতে থাকি। মা’য়ের চাপাচাপিতে বাবা ইংরেজ হয়ে পাপা হয়ে গেল, মানে আমি পাপা ডাকতে শুরু করলাম। মা দুটো অপশন দিয়েছিল, পাপা অথবা পাপাই। ওই ছোট্ট মাথায় পাপা ডাকটাই কম ঝামেলার মনে হল, বাবা-র  সাথে পাপা অনেকটা মিলেও যায়। 

পাপা আমাকে তার মনের মত তৈরী করার জন্যে একটা স্তর অবধি চেষ্টা করতেন, আর আমি তার প্রায় কোনটাই হতে দিতাম না; তার মধ্যে সবচেয়ে যেটা খারাপ ছিল সেটা হচ্ছে পড়াশুনো; ছি ছি, এটা কি কোন সুস্থ বাচ্চার কাজ? আমাদের ইস্কুলের জবরদস্তি পড়াশুনো যদি কোনও বাচ্চার ভালো লাগে তাহলে তার সুস্থতা নিয়েই কেমন যেন সন্দেহ জাগে। সে যা হোক, পড়াশুনোরই জয় সর্বত্র। কিন্তু এ ব্যাপারটা কেমন যেন কখনোই মানতে পারতাম না।

পড়াশুনো করার একেবারেই যে চেষ্টা করিনি তা নয়। কিন্তু বই-এর লেখাগুলোর সাথে আমার সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা জানার কেমন যেন জুঁতসই কোনও মিল পেতাম না। যেমন ধরুন এক ধরনের অঙ্ক  কষতে হোত, তার নাম ছিল “সরল”। “সরল” যে কেন সরল, তার সরলতাই ঠাহর করে উঠতে  পারতাম না, এই সরল যে কোন কাজের তাও মনে হত বোঝা জানার বাইরে।

আমার তখন অনেকটাই বয়েস, বুড়াই বলতে পারেন। একটি উচ্চশিক্ষণ-সংস্থা আমাকে বায়ুযানের ভাড়া-পত্তর দিয়ে কথা-বার্তা বলতে ডেকেছিল। সেখানেও বহু পণ্ডিতের মাঝেও প্রশ্নটা রেখেছিলাম। বলেছিলাম যে ছোটবেলায় সরল করার চেষ্টা করতাম যেখানে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, এর, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ব্রাকেট ইত্যাদি নানা রকম অশান্তি থাকত, আর তারপর তার উত্তর বেরুত “১”। আমি এখন ও বুঝে উঠতে পারলাম না ওটা কি করে ছবি এঁকে বোঝানো যাবে, আর কোন মাষ্টারমশাই ওটা বাচ্চাদের সেভাবে বুঝিয়ে থাকেন। যদি এটা না বোঝানোই যায় তাহলে অত  কঠিন করে ১ উত্তর জেনে কি লাভ? তখন এক অঙ্কের পণ্ডিত বললেন, আমরা যদিও ও ভাবে অঙ্ক শেখাই না, কিন্তু আপনি ফিনল্যান্ডের অঙ্ক শেখানোর পদ্ধতি দেখুন। মশাই; থাকি ভারতে, ফিনল্যান্ড দিয়ে আমি কি করব?   

সে যা হোক, কোনও কিছু মাথা-মুন্ডু বুঝতে না পেরে, পড়াশুনো ডকে উঠল। আমি মন দিয়ে গান-বাজনা করি পাপা এর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন, উনি চাইতেন আমি ভালো করে পড়াশুনো করে, বিজ্ঞানী হব, বিশ্বিদ্যালয়ে পড়াব। আমি কোন পশ্চাতাপ ছাড়াই ওর সে সব আশায় সফলতার সাথে জল ঢেলে দিয়েছি। যদিও দেশে ও বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি, কিছুটা হয়ত গবেষণার সাথেও  জুড়েছি; কিন্তু সেটা কোনভাবেই প্রচলিত লোকমান্য বিজ্ঞান নয়। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, ভারতীয় গান-বাজনা বা তার সাথে জোড়া বিষয় নিয়ে সময় কাটিয়েছি, এই বিশেষ জ্ঞানের সাথে হয়তো বা কখনও  “পলব” বা “প্রচলিত লোকমান্য বিজ্ঞান” জুড়ে গিয়েছে; পড়াশুনো করেছি, কিন্তু সেটা চাপিয়ে দেওয়া নয়, নিজের খুশিতে মহা আনন্দে। যা পড়তে ইচ্ছে হয়েছে পড়েছি, জেনেছি, আর তার প্রয়োগ করেছি। এই বয়েসে এসে মনে হচ্ছে, যা করেছি তা যেন সব ভুল করে ঠিক হয়ে গিয়েছে!    

সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৽ কলকাতা ৽ ১৫ জুলাই ২০২৫

भूल से बनी बात

सन 1956 की बात है। मेरी उम्र तब दो साल के करीब रही होगी। हम रसा रोड की एक किराए की मकान में रहते थे। मम्मी ने एक दिन ऐलान किया—“अब से ‘बाबा’ नहीं, तुम्हें ‘पापा’ कहना है।” विकल्प भी दिया: ‘पापा’ या ‘पापाइ’। मेरी नन्हीं सी बुद्धि ने तुरन्त ‘पापा’ चुन लिया—कम बोझ, ज़्यादा मेल।

अब पापा की तमन्ना थी कि मुझे अपने जैसा बना दें। उन्होंने पूरी योजना बना रखी थी — मैं खूब पढ़ूँ, साइंटिस्ट बनूँ, और अंत में विश्वविद्यालय में प्रोफेसर बनकर देश की सेवा करूँ। मगर मैं था कि हर मोड़ पर उनकी योजना में पेंच लगा देता।

सबसे बड़ी लड़ाई पढ़ाई को लेकर हुई। मुझे किताबों से अजीब सी चिढ़ थी। स्कूल की ज़बरदस्ती वाली पढ़ाई तो जैसे किसी मानसिक अत्याचार से कम नहीं लगती थी। और फिर वो ‘सरल’ गणित! नाम था ‘सरल’, पर उसमें जोड़, घटाव, गुणा, भाग और न जाने कौन-कौन से ब्रैकेट! और नतीजा? “1”! अब भला बताइए, इतनी जहमत उठाकर अगर अंत में ‘1’ ही पाना है, तो वो झंझट क्यों? मुझे तो बचपन से यही लगता था कि ‘सरल’ के नाम पर बहुत बड़ा धोखा है।

सालों बाद, जब बाल सफेद हो गए और वक्त कुछ धीमा चला, मुझे एक नामी संस्थान ने बुलाया—हवाई जहाज का टिकट भेजकर! वहाँ बड़ी-बड़ी हस्तियाँ बैठी थीं, और मैं वही पुराना सवाल उठा लाया: “ये ‘सरल’ वाला हिसाब बच्चों को आखिर क्यों सिखाया जाता है?” एक विद्वान बोले, “आप फिनलैंड की मैथड देखिए।” मैंने सोचा, “मियाँ, फिनलैंड से पहले तो मुझे अपना बचपन ही समझ नहीं आया।”

ख़ैर, पापा को मुझसे जो उम्मीदें थीं, उनमें मैंने पानी ही फेरा। उन्होंने सोचा था, मैं लैब को चमका दूँगा। मैंने सितार को चमका दिया। उन्होंने चाहा मैं विज्ञान में शोध करूँ। मैंने रागों में जीवन खोज निकाला। वे चाहते थे कि मैं क्लासरूम में लेक्चर दूँ, मैंने मंच पर अलाप छेड़ दिए।

आख़िर में क्या हुआ? पढ़ाई की — लेकिन अपनी पसंद से। जो दिल चाहा, वही पढ़ा। और वही अपनाया। बिना पछतावे के। आज जब पीछे मुड़कर देखता हूँ, तो लगता है—सब कुछ गलतियों से ही सही, पर सही दिशा में चला गया।

कभी-कभी, ज़िंदगी भी ‘सरल गणित’ की तरह होती है—समझ में नहीं आती, लेकिन अंत में उत्तर ‘ठीक’ ही आता है।

জাদু ছিল ওই দরজা পেরিয়ে…

হোয়াটস-অ্যাপের ফ্যামিলি গ্রুপে রাতুর এত সুন্দর লেখা পড়ে আমারও কেমন যেন বেশ লেখা-লেখা পাচ্ছে। এটা অনেকটা সেই খোঁড়ার অলিম্পিক দৌড়নোর ইচ্ছের মত। খোঁড়া বলে কি কিছুই করব না? অলিম্পিক না দৌড়োই, আট-দশ পা হাঁটার চেষ্টা করতে আপত্তি কোথায়?

এই তো সেদিনের কথা। তখন আমি কিছুটা ছোট সাইজের ছিলাম, আরে না না, পাড়ার হুলো বেড়ালটার থেকে বেশ কিছুটা বড়ই ছিলাম। সে কি, এতে হাসার কী আছে? মানুষকে এরকম টাক-মাথারই থাকতে হবে এরকম কোন মাথার দিব্যি আছে নাকি? বিশ্বাস কর বা না কর তখন আমার মাথা ভর্তি চুল ছিল আর ভুঁড়ি একেবারেই ছিলনা।

যাদবপুরে আমার এক স্বপ্নপুরী ছিল। হ্যাঁ, ওই সেই সাদা গোল বাড়িটা, আর তার ব্রাউন রঙের দরজা, একটা গোল হাতল যেটা ঘোরালেই দরজা খুলে যেত, আর সেই দরজার ওপরে পিতলের ফলকে লেখা 37/5 জ্বল-জ্বল করত। বাড়ীর সামনে এক-ফালি জমি, তাতে কিছুটা বাগান, জমি পেরিয়ে লাল সিমেন্টে সবুজ বর্ডার দেওয়া বারান্দা। জাদু ছিল ওই দরজা পেরিয়ে।

দরজা পেরিয়ে ছোট্ট একটা ঘর, এ ঘরের চেহারা মাঝে মাঝেই বদলাত। কখন তাতে পড়ার টেবিল, কখন বসার জায়গা, কখনো খালি, কখন মোটর-সাইকেল, কখন কোন সকালে টেবিলের ওপর চেয়ার চড়িয়ে তার ওপর ছোট্ট দাদার গ্যাঁট হয়ে বসে মহারাজ হয়ে যাওয়া, বা দেখিয়ে দেখিয়ে মজা করে অল্প অল্প নুন খেতে খেতে ছোড়দির গুন-গুন করে গান গাওয়া। জিজ্ঞেস করলাম, “কি খাচ্ছিস রে?” উত্তর এলো “খাবি?” বললাম, “হ্যাঁ”। “তাহলে চোখ বন্ধ করে হা কর।“ তার পর মুখে এক মুঠো নুন ঠুসে দেওয়া — হা হা হা হা হা।      

ছবিতে যাদের দেখা যাচ্ছে সে সম্বন্ধে ছোড়দি [সমাপিকা] জানাল যে বাঁ-দিক থেকে ডান দিকে, (১-২) দাদা [মহীরূহ]  ছোড়দিকে [সমাপিকা] ধরে দাড়িয়ে, (৩) দিদি [স্বাগতা] , (৪) সেজদি [সীমন্তিকা],  আর (৫) মেজদি [সুশান্তা । [৩০ ডিসেম্বর, ২০২৪]

সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৽ কলকাতা ৽ ২৮শে ফেব্রুয়ারী ২০২৪      

আরেকটু : লেখা প্রকাশের প্রায় ১১ মাস পর ছবিটা জুড়ে দিলাম। ছবি পরিচিতি আরও দিন দুয়েক পরে।

বুড়ি ও বুড়ো

রচনা: কেমনামি বোকানি 

একটা ছিল বুড়ো, একটা ছিল বুড়ি। 

থুড়ি,  

একটা ছিল বুড়ি আর একটা ছিল বুড়ো,

একজন গাইত গান আর অন্যটা বাটত মুড়ো। 

দুটোই ছিল পাগল, একটা সেয়ানা আর একটা আস্ত, 

কে যে কোনটা সেটাই ধাঁধাঁ। 

ধাঁধাঁর  উত্তর কেউ বলেনা, 

বললে পরেই পড়বে হানা,

আরে না না না না। 

বুড়ো বুড়ির আড়ি হবে,

ভাববে তারা, 

আমার ঘাড়ে ওরটা কেন পড়ে?

আস্ত হই বা সেয়ানা, কার তাতে কি?

জমিয়ে থাকি এটাই বড়,

নইলেই বিপত্তি।   

কলকাতা | ১৫.০৯.২০২১

ক্ষেত ভরে যাবে শস্যে

আমি জানি,

তোর ক্ষেত ভরে যাবে শস্যে,

সে বর্ষা নামুক বা না নামুক।

আমি জানি,

তোর কাছে আছে সেই চাবিকাঠি,

যাতে জল আছে, আছে প্রাণ।   

তোর জলের স্নেহে আসবে নতুন পাতা,

তরতরিয়ে উঠবে নতুন শাখা,

গুন গুনিয়ে আসবে ভোমরা

আসবে রঙিন প্রজাপতি

গাইবে পাখি, আসবে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে। 

তোর বাগান উঠবে মেতে,

সে বর্ষা নামুক বা  না নামুক।

কলকাতা, ০৭ অক্টোবর ২০২১