জনপ্রিয় তারকাদের সাধারণ মানুষের চুল ও সাজের ওপর প্রবল হস্তক্ষেপ চিরকালের| সে তারকা সিনেমা, রাজনীতি, খেলাধুলা, গান-বাজনা বা যে কোনও বিষয়েরই হতে পারে| 1970-এর দশকে ‘ভালো’ বিশেষণটা অনেকটাই পুরাতন ভিত্তিক ছিল| চুল ছোট-ছোট করে কাটা হত, এতে বেশিদিন চলে যেত| কিন্তু রূপালী পর্দায় বড় বড় চুল ওয়ালা নায়কের নাইকাকে ইমপ্রেস করা থেকে শুরু করে ভিলেনকে ঢিসুম-ঢাসুম করে মেরে হারিয়ে দেওয়াতে দর্শক প্রভাবিত হয়ে যেত আর চোখ গিয়ে পড়ত নায়কের চুলে| তার থেকেই চুল কাটার দোকানে শুরু হয়ে গেল উত্তম কাট, দেবানন্দ কাট, ধর্মেন্দ্র কাট, আরও নানা শৈলীর কেশ-কর্তন| যুবসমাজের চুলের দৈর্ঘ ক্রমশ লম্বা হয়ে গেল| প্রবীণেরা এতে ক্ষেপে উঠলেন, নতুনদের বড়-চুল ওয়ালা অসভ্য বলতেও ছাড়লেননা| বোধ হয় বয়স বেড়ে গেলে কম বয়েসিদের ওপর হিংসাও হয়| এ ছাড়া ‘অতীতের সবই সুন্দর’ বা ‘স্মৃতি সততই সুখের’ থেকে অনেকেই বেরুতে পারেন না; নতুনের সাথে তালে তাল মিলিয়ে চলা তো এঁদের স্বপ্নাতীত; নতুনেরা বলে এটা নাকি একটা জেনেটিক ডিফেক্ট| এটা নাকি বাবারও ছিল, দাদুরও ছিল, আর তার বাবারও ছিল|
মনে আছে ‘পাপা’ মানে আমার বাবা আমার গোঁফ রাখার চেষ্টায় ব্যাগড়া দিয়েছিলেন, বললেন গোঁফ নাকি গুন্ডারা রাখে| এখন বুঝতে পারি যে, হয়তো দু-চারজন সমাজ-বিরোধীর ওপর ওনার চোখ গিয়েছিল তাদের মধ্যে কারুর কারুর হয়তো গোঁফ দেখেছিলেন| সে-সময়ের নকশাল আমলে পুলিশের ধড়-পাকড় খুব বেড়ে গিয়েছিল| ওনার হয়তো মনে হয়েছিল অ্যামার গোফে পুলিশ প্রভাবিত হয়ে বিনা দোষে গ্রেপ্তার করে নিতে পারে| সে-সময়ে বড়দের কথা মাথা ঝুঁকিয়ে মেনে নেওয়াই সাধারণ প্রথা ছিল, কেউই খুব একটা ভেরিফিকেশন ভ্যালিডেশন এ যেতনা| আমার তো বহু বছর পর্যন্ত্য বদ্ধমূল ধারণা ছিল বড়রা যা বোঝে-জানে সবই ঠিক| হয়তো বা এই কারণেই বড়রা অনেক সময়েই আমাকে গবেট বলতেন|
1974-75এ আমি প্রথম বম্বেতে বাজাতে যাই| ওখানকার একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্থা নতুনদের বাজানোর সুযোগ দিত আর ভালো গান-বাজনা করে শ্রোতাদের খুশি করতে পারলে পদবী দিতো আর খুব নামী ‘স্বামী হরিদার সঙ্গীত সম্মেলনে’ শীর্ষস্থানীয় গাইয়ে-বাজিয়েদের মাঝে বাজানোর সুযোগ দিত| বম্বে, রায়পুর, জবলপুরে বাজিয়ে কলকাতা ফিরেছি সঙ্গে ‘সুরমণি’ পদবী, বেশ একটু অহংকার অহংকার ভাব, তিনটে অনুষ্ঠানই সুপার-হিট| শ্রোতারা শুধু প্রশংসায় পঞ্চমুখ নয়, যেন দশানন হয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি প্রশংসা করছে|
ওস্তাদজীর কাছে গেলাম, চেহারা দেখেই এক নজরে বুঝে গেলেন ‘ছোড়া বিগড়োচ্ছে’| জিজ্ঞেস করলেন, “বাজনা কেমন হল?” সব শুনে বললেন, “ঠিক আছে”| পরের দিনই দেখলাম বিধি বাম| যন্ত্র নিয়ে সবে ঢুকেছি, আমার দিকে আপদ- মস্তক তাকিয়েই হুঙ্কার, “বেশি পেকেছ?” আমি তো হতভম্ব, হলো কি!! “চুল বাড়িয়ে পন্ডিতজী হবে? যাও চুল কেটে এসো, না হলে এ বাড়িতে ঢুকবে না|” রবিশংকরজী চুল বড় রাখতেন, আমিও ফাঁকতালে হিরো হবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বুড়োর চোখ এড়াতে পারলে তবে না–| অতএব, মনের দুঃখে গুটি গুটি পায়ে যাদবপুর বাজারের কাছে নভেলটি সেলুনে গিয়ে চুল কাটুয়ে আসলাম| তারপর শেখা শুরু হল, “বাজাও” — জয়ন্তী মল্লার!