অধ্যাপক পিনাকেশ সরকারকে সারা জীবন দাদা-ই বলে-ডেকে এসেছি। পাড়াতে ওই 24 ইঞ্চি ঘেরের ঢিলে পাজামা সাথে কখনও শার্ট বা পাঞ্জাবি, আর বাইরে খুব যত্নে কোঁচানো ধুতি সাথে বোতাম হাতার পাঞ্জাবি – একেবারে কিলার চেহারা| পিনাকেশদার সাহিত্যিক, কবি, ও বিদগ্ধ চিন্তক বৃত্তে একটা জাঁদরেল উপস্থিতি ছিল। 1960-র দশকে বাংলায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাদার বিএ অনার্স আর এমএ দুটোতেই প্রথম হবার নম্বর একটা বিরল ঘটনা ছিল। ওঁর সহকর্মী শঙ্খদার সাথে অদ্ভুত বন্ধুত্ব-ভ্রাতিত্ব দূর থেকে চোখ ভরে দেখেছি| শঙ্খদা—কবি শঙ্খ ঘোষ—শুধু কবি নন, বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক বিবেকের অন্যতম মুখ ছিলেন। দাদা জানে কিনা জানিনা, অনেকেই পেছনে পেছনে ওঁদের জুটিকে ‘পিনাকেশ-বিনাকেশ’ বলত। বয়সের সাথে শঙ্খদা-র চুল অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এসব সাহিত্যর কথা এখন একটু তোলা থাক| শিশিরদার কাছে শুনেছি ওঁর নাকি কলকাতার এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবার কথা ছিল কিন্তু নানা কারণে ওটা আর হয়নি| এতে খারাপ না হয়ে হয়ত ভালোই হয়েছে, সে সময়ের অস্থির কলকাতায় হয়তো শান্তির থেকে অশান্তি পাল্লা ভারী হয়ে উঠত|

পিনাকেশদার সাহিত্যিক, কবি, ও বিদগ্ধ চিন্তক বৃত্তে একটা জাঁদরেল উপস্থিতি ছিল।
আমার ধারণা আমার মনে পিনাকেশদার দাদাবস্থানের গোড়াপত্তন মনে হয় 1973-74 নাগাদ| ওস্তাদজির বাড়ির পরে একটা বাড়ি ছেড়ে যাদবপুরের কালীবাড়ি লেন-এ বাঁ-দিকে একটা গলি চলে গিয়েছে। সেই গলি দিয়ে দু-চার পা হাঁটলেই দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে খুব-সরু আরেকটা রাস্তা ডান দিকে ঢুকে গেছে। ওখান দিয়ে দু-পা গেলেই বাড়িতে ঢোকার দরজা, লাল সিমেন্টের তিনটে সিড়ি পেরিয়ে ডান দিকে পিনাকেশদার ফ্ল্যাটের দরজা ও কলিংবেল। বুধবার ওস্তাদজির কাছে শেখার পরেই সকাল সাড়ে নটায় বৌদি ও দাদার কানে ডিং-ডং বেজে উঠত। বেশিরভাগ সময়েই বৌদি দরজা খুলত, কখনও কখনও দাদা। প্রায়ই সাথে সাথে দাদার নাগাল পেতাম না, অন্য ঘরে কাজ করতেন, তারপর এ ঘরে এসে, “বল, সঞ্জয়—”| আধ-ঘণ্টা নানা বিষয়ে যুক্তি-তর্ক-গপ্প; ছুটির দিন হলে আধ-ঘণ্টা বেড়ে হয়তো বা তিন ঘণ্টা। সময়টা যে কি করে ফুরুৎ করে শেষ হয়ে যেত – টেরই পেতাম না| প্রায়ই আমাদের বাদানুবাদ রাধিকা মোহন থেকে বিলায়েত খান থেকে হরি প্রসাদ চৌরসিয়া থেকে নিখিল ব্যানার্জি থেকে সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে দেশে পত্রিকায় সমালোচনা, স্টেটসম্যান, যত্র তত্র অনায়াসে বিচরণ করত। এখানে একটা জরুরি কথা বলে নেওয়া দরকার, দাদা আর ওস্তাদজির মধ্যে বয়সের ফারাক অনেকটা থাকলেও প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। দাদাও ওস্তাদজিকে বাঁধনছাড়া শ্রদ্ধা করতেন।
পিনাকেশদার বিশেষ অবস্থান আমার বেড়ে ওঠা, বোঝার শৈলী ও অভিব্যক্তিতে নানা দিক দিয়ে প্রভাব ফেলেছে|
এক
এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। তখন নীলাক্ষদা মানে নীলাক্ষ গুপ্ত কলকাতার বুকে একজন ডাকসাইটে সংগীত সমালোচক, আনন্দবাজার পত্রিকা, সানডে, দেশ সাপ্তাহিক সবেতেই উনি বড় বড় নামী ওস্তাদদের ভুল ধরাচ্ছেন, এমন কি রবিশঙ্করজি ও ছাড়া পাচ্ছেন না। উনি একেবারে সরগম দিয়ে কোথায় কথায় রাগচ্যুতি ঘটেছে সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে মালুম করিয়ে দিচ্ছেন। বাবলু আমার বন্ধু। ও বলল, কি রে, নীলাক্ষ গুপ্তর কলম বন্ধ করাতে পারবি? ওর ক’দিন পরেই সি-এল-টির অবন মঞ্চে আমার বাজনা ছিল। ভাবলাম কি করে নীলাক্ষদার রাগাস্ত্র থেকে বাঁচা যায়। ভাবলাম এমন রাগ যদি নেওয়া যায় যেটা ওনার জানা নেই তাহলেই ফসকে যাওয়া সহজ হবে| গুরুর নাম নিয়ে ঠিক করলাম ছায়া বেহাগ বাজাব, তার পরই শুরু করলাম দিন-রাত রেয়াজ| ভোরবেলাও ছায়া বেহাগ, দুপুরেও ছায়া বেহাগ আবার রাত দুটোতেও ছায়া বেহাগ| পর্দা উঠতেই দেখতে পেলাম বাংলার বাঘেরা সব বসে আছেন, নিলাক্ষদাও তৃতীয় সারিতে ভুল ধরার জন্য সজাগ অবস্থান করছেন| উস্তাদ আসলাম খানের তবলার সাথে ছায়া বেহাগ বেশ জমে গেল| বুদ্ধদা, মানে, পন্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কেন জানি শেষের সারিতে গিয়ে বসেছিলেন| ওনার জোরে জোরে তারিফ সবার কানেই পৌছুচ্ছিল| সামনের সারিতে ওস্তাদজী ছিলেন; বেরুনোর সময় লাঠি উঁচিয়ে বললেন, “সব শুনে নিয়েছি, বাইরে এসো — হবে—“ আপনারা বুঝলেন তো, বাইরে বেরুলেই উত্তম মধ্যম| অনুষ্ঠান হয়ে গেল| আমি তো ওস্তাদজির বাড়ির সামনের রাস্তাই ছেড়ে দিলাম, দেখতে পেলেই ঝাড় খাব| কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে পিনাকেশদার বাড়ি যেতাম আর ওখান থেকেই খবর পেতাম, “তুমি সব ভুল-ভাল বাজিয়েছ; রাধুদা খুব খেপে গ্যাছেন| যাও, গিয়ে দেখা কর|” আমি বললাম, “পাগল? মাথা ঠান্ডা হোক তারপর দেখা যাবে| সবথেকে বড় কথা, উনি যা শিখিয়েছেন তাই বাজিয়েছি| ভুল হলে তার দায়িত্ব কি আমার?” এসব নিয়ে দাদা-ভাইয়ের মহা বাক-বিতণ্ডা, বৌদি মাঝে এসে বললেন, “অনেক হয়েছে, এবার থামো|” তিনদিন পরে স্টেটসম্যান এ বুদ্ধদার লেখা সমালোচনা বেরুল| উনি লিখলেন যা বাংলা করলে দাঁড়ায়, সঞ্জয় যেমন ভাবে ছায়া বেহাগের স্বর-বিন্যাস করেছে এতে অসাধারণ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে আর এভাবেই হওয়া উচিত| আমি তো ওই লেখা পড়ে বুক উঁচিয়ে পিনাকেশদার বাড়ি গেলাম| এর মধ্যে ওস্তাদজী পড়ে গেলেন বিপদে; এক ছাত্র রাগটা অন্যভাবে বাজিয়েছে আর অন্য ছাত্র গণমাধ্যমে তার প্রশংসা করছে| পরে দাদার কাছে শুনেছিলাম যে ওস্তাদজি বলেছেন, “আমিই বোধ হয় ওদের ঠিক করে শেখাতে পারিনি|” এ নিয়ে ওস্তাদজী আর কিছু বলেন নি| আর, নীলাক্ষদার দেশের সমালোচনাতে রাগের শুদ্ধতা নিয়ে কোন কথা ছিলনা|