মেজদির কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। অনেক সময় পল্লিশ্রীর মোড়ের কাছে পৌঁছুলেই অজান্তে পা এগিয়ে যায় যাদবপুরের দিকে। হ্যাঁ, বেশিরভাগ সময়ই হেঁটে হেঁটে যেতাম ২২ নম্বর কালীবাড়ী লেনে। ওটাই ছিল আমার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট।
মেজদির বিয়ের পর থেকেই ওই বাড়িতে আমার ঘন ঘন যাতায়াত। বাদলদা আমাদের প্রথম জামাইবাবু। বিয়ের পরদিন বাদলদার সেই অবাক চোখদুটো আজও মনে পড়ে। মেজদির বিয়েতে প্রবল আপত্তি ছিল, আর সেই আপত্তির রীতিমতো প্রকাশ ঘটেছিল বিয়ের দিন বিকেলে। তার ধাক্কাটা গিয়ে পড়েছিল দিদিনের ওপর। দিদিন বয়সে বড় হলেও তখনও তাঁর বিয়ে হয়নি। সে গল্পে একটু পরে আসছি।
আমাদের বাড়ির প্রথম বিয়ে, আর তার শুরু মেজদিকে দিয়েই। মেজদির স্কুলের জাঁদরেল হেডমিস্ট্রেস প্রতিভাদি। তাঁর ভয়ে নাকি ইস্কুলে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত! সেই প্রতিভাদিই একদিন হঠাৎ জ্যাঠার কাছে হাজির। এসেই মেজ ছেলের সঙ্গে মেজদির বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। ব্যস, তারপর আর কী! ভিনি, ভিডি, ভিসি—গটগট করে এলেন, কথা বললেন, মেয়ে দেওয়ার সম্মতি নিয়ে চলেও গেলেন।
বাদলদা কিন্তু বিয়ের আগে মেজদিকে দেখেননি। অবশ্য লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখে থাকলে সে কথা হলফ করে বলতে পারব না। শুনেছি, বাদলদাকে মেয়ে দেখার কথা বলা হয়েছিল। বাদলদার সোজাসাপটা উত্তর, “মা দেখে নিয়েছে—আমার ওসবের দরকার নেই।”
প্রতিভাদি নাকি বলেছিলেন, “সুশান্তাকে ইস্কুলে দেখেছিলাম। তখন থেকেই ভেবেছিলাম, একে বাড়িতে নিয়ে আসব।”
সে যা হোক, বাদলদা বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে বিয়ে করতে এলেন। শুভদৃষ্টি হল। আর তখনই অধীর আগ্রহে মেজদিকে দেখে নিলেন। বিয়ের আগে যাঁকে দেখার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করেননি, বিয়ের মুহূর্তে তাঁকেই দেখার জন্য সেই অপেক্ষা!
মেজদির বিয়ে নামক ব্যাপারটাতেই প্রবল আপত্তি ছিল। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে সারাদিন মুখ গোমড়া, আর কেমন যেন রাগে টগবগ। দেখতে দেখতে ৮ই মে এসে গেল। সালটা বোধহয় ১৯৭১।
কনে সাজানোর ভার দিদিনের। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সাজানোর তোড়জোড় শুরু হল। মুখে প্রলেপ পড়ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে মেজদির ঝামটা, “মুখ জ্বলে যাচ্ছে! লঙ্কা বাটা লাগিয়েছে—”
দিদিন চুপচাপ।
দু-তিনবার মুখে জল দিয়ে প্রলেপ তুলে দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত যেন মেজদি একটু সয়ে নিল। কতবার আর মানুষ দৌড়ে দৌড়ে মুখ ধুতে যাবে! তার ওপর সকাল থেকে খাওয়া নেই—বিয়ের উপোস। মেজদি একটু নিস্তেজ হয়ে এল বটে, কিন্তু বিয়ের কথা মনে পড়লেই রাগটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল।
অবশেষে বিয়ে সাঙ্গ হল।
পরের দিন বিকেলে মেজদি বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় মেয়েরা সাধারণত কাঁদে। দুঃখে, না সুখে, কে জানে! কিন্তু মেজদির চোখে জলের কোনও নামগন্ধ নেই।
জানা গেল, গাড়ি বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রাখতে হয়েছে। খবরটা মেজদিরও জানা ছিল।
বাড়ির দরজা পেরিয়েই দেখলাম, মেজদি গটগট করে হাঁটতে শুরু করেছে। যেন কোথাও এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর ইচ্ছে নেই। বাদলদা তো অবাক! এ কী! বউ পালিয়ে যাচ্ছে না তো?
তখন বাদলদাও প্রায় দৌড়ের মতো হাঁটতে শুরু করলেন। সামনে মেজদি, আর পেছনে বাদলদা—বিয়ের পরদিন বড়বউয়ের এমন হাঁটার রেস আগে কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না।
পরে বোঝা গেল, দিদিনের ওপর রাগ দেখিয়েও ওটা তখনও পুরোপুরি পড়েনি। মেজদির সেই দ্রুত পায়ের মধ্যে যেন একটা না-বলা কথা ছিল—আমাকে যখন এ বাড়িতে পছন্দ হচ্ছে না, ঠিক আছে, এই আমি চললাম!
মজার ব্যাপার হল, এই প্রবল বিয়ে-বিপ্লবী মেজদিই বিয়ের পর অত্যন্ত সাবলীলভাবে জমিয়ে সংসার করেছিল। বাবার বাড়ির মানুষ-জনে আর শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের সঙ্গে এক অদ্ভুত তালমিল রেখে চলার যে শৈলী ওর মধ্যে দেখেছিলাম, তা আজও কেমন যেন উদাহরণ হয়ে রয়ে গেছে।
মেজদিকে নিয়ে আমার অসংখ্য গল্প। তেমনই কত গল্প বাদলদাকে নিয়েও। একদিন তেলেভাজা-মুড়ি আর গরম চায়ের সঙ্গে বসে সেসব গল্প হবে।
আজ এই থাক।

আমার আর মেজদির একটি পুরনো ১৯৬০এর দশকের শেষের দিকের ছবিকে মূর্তিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। [সুশান্তা ব্যানার্জি (পরে শিরোমণি) ও সঞ্জয় ব্যানার্জি (পরে বন্দ্যোপাধ্যায়)]
