শিল্পী-মন, সৃষ্টি-চেষ্টা, বারান্দা, ও ছাদ

তখন ১৯৭২, স্থান রাইফেল ক্লাব ওয়েস্ট, বাঁশদ্রোনী ।

এই সিড়িটা উঠে গিয়েছে এক মন ভোলানো ছাদে, যেখানে ভালোবাসার ব্যথায় বহু চোখ উদাস চোখে আকাশ দেখেছে, কখনও বা বেশ কিছু মানুষ নানা রঙ সুর আর ভালোবাসা মেলানো সৃষ্টিতে মশগুল হয়েছে, কখনও বা কোনও রাগী মন ইঁট-বালিশে শুয়ে রাগ প্রকাশ করেছে – আরও কত জানা-অজানা ভাবের সাক্ষী ওই ছাদ|

মনে পড়ে, গৌরী প্রসন্ন বা শক্তি ঠাকুর, বা শিল্প-ভাবনায় ডুবে থাকা অন্য বহু মন ওই তার-কাঁটা ঘেরা পরিসরে মন উজাড় করে শিল্প সৃষ্টি করেছে| কখনও গান, কখনও কবিতা, কখনও তবলা, বা কখনও নাটক নিচের ঘেরা বারান্দা থেকে ওপরের ছাদ সব মিলিয়ে স্বচ্ছন্দে ছোটাছুটি করে বেড়িয়েছে|

ছোড়দির উঠল বাই কটক যাই স্টাইলে হঠাৎ হঠাৎ সৃষ্টি, মনের খুশিতে গান গাওয়া, কবিতা লেখা, আর অনুষ্ঠানের আয়োজন| সেই অনুষ্ঠানে বাড়ীর মানুষ, প্রতিবেশী শিল্পী আর নাম করা শিল্পীরাও মহা আনন্দে স্বতস্ফূর্ত যোগ দিতেন|   

বড় জ্যাঠার শৈল্পিক মন এতই বিস্তৃত – এত রকমারী – তা ধরে বুঝে নেওয়া কঠিন| গান – সাহিত্য – পাক-কলা, ওঁর অভিব্যক্তির ঢং – শৈলী এসব নিয়ে বলা শুরু করলে কোথায় ঠেকবে জানিনা| ওঁকে নিয়ে কখনও আলাদা করে গল্প বলার ইচ্ছে রইল| মেজদি আবার চুটিয়ে ছবি আঁকত – কবিতাও লিখত|  কিটুর প্রচণ্ড আবেগ, প্রচণ্ড চেষ্টা, ক্ষুরধার বুদ্ধি – সে তো দিনে 11 ঘণ্টা 21 দিন তবলা রিয়াজ করবে প্রতিজ্ঞা করে বাজনা শুরু হল| তার পর হাত ফেটে রক্ত – তারপরও ব্যানডেজ বেঁধে প্রতিজ্ঞা পুরো করা| এই তীব্র ইচ্ছে আর চেষ্টা ওই পরিসরেই জন্ম নিয়েছে – প্রকাশিত হয়েছে| আমিও সেতার বগলে কখনও হাজির হয়ে যেতাম আনন্দে ভাসতে|    

মনে পড়ে ঠাকুর ঘরের খাটে বসে দিদিনের গানের রেয়াজ সাথে সমীর মজুমদারের গম্ভীর ঠেকা আর বিলম্বিত একতালের আবর্তনের স্নিগ্ধ অনুভূতি। দরজা পেরিয়ে বারান্দা, সেখানে ইজি চেয়ারে চোখ বন্ধ করে জ্যাঠার গান শোনা।

সেজদির মজা নেওয়াটা অন্যরকম  ছিল। সে অন্যের সৃষ্টিতে মশগুল। মাঝের ঘরের খাটে প্রায়ই সেজদিকে দেখা যেত। কখনও বসে, কখনও শুয়ে, বইয়ের নিচে বই গুঁজে চুপি চুপি উল্টোরথ পড়া, কখনও মলাট-খোলা শরৎচন্দ্র, শঙ্কর, সমরেশ বসু, বা প্রবোধ সান্যাল| কম বয়সের অহেতুক বাঁধনের বেড়া ও বুদ্ধি করে বাঁধন এড়ানোর মজা, বুঝে বা না-বুঝে সেজদির অনুভূতির ব্যাঙ্কে জমা হতেই থাকত|