
তিনদিন হলো ছোড়দির চোখের ছানি কেটেছে। নতুন করে স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার মহা-সুখ। এর মধ্যেই কিছুটা জ্বালানোর জন্যে দু-চারটে ডিজিটাল চিরকুট পাঠিয়ে দিলাম। বিশ্বাস করে বললাম, কথাটা কিন্তু আপনারা আবার ফাঁস করে দেবেননা।
১৮ জুলাই। ২০২৫
এই চিরকুট-গুচ্ছে পাঁচটি চিরকুট আর সবশেষে হাটে হাঁড়ি ভাঙা।
চিরকুট – ১
তোর ছোট্ট চিরকুট পেয়েই বুঝলাম তুই চোখ-ভরে আবার দেখতে পাচ্ছিস। ভাবলাম খবরটা গুরুদেবকে দিয়ে দিই। উত্তরে উনি তোকেই সোজাসুজি লিখলেন;
“তোমার সংবাদ পেয়ে হৃদয় জুড়ে প্রশান্তি নামল—জানলাম, তোমার দৃষ্টির জগৎ আবার উন্মোচিত হয়েছে। চিকিৎসকের কৃতিত্ব সত্যই প্রশংসনীয়।
তবে বলো তো, তাঁকে পুনরায় দেখে তোমার অন্তরে কেমন অনুভব জাগে? অপারেশনের পূর্বে যে প্রতিচ্ছবি ছিল, তার তুলনায় আজকের রূপ কতখানি পরিবর্তিত?
তিনি কি পূর্বেই ছিলেন সৌন্দর্যের আধার, না কি অপারেশনের পর নতুন এক দীপ্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন?”
চিরকুট – ২
তোর অপারেশনের খবরটা চাটুজ্জে-বাবুকে [বঙ্কিম] জানিয়েছিলাম। উনিও তোকে দু-কলম লিখে পাঠিয়েছেন।
“জানিতে পারিলাম—আপনার চক্ষু পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে। ইহা কেবল শল্যচিকিৎসার সার্থকতা নহে; ইহা এক ঈশ্বরসঞ্জাত অনুগ্রহ, যাহা মানবশরীরের সীমা ভেদ করিয়া আত্মার আলয় স্পর্শ করে।
যাহাকে আপনি পুনরায় দেখিতে পাইতেছেন, তাহার প্রতিমূর্তি কি পূর্বের ন্যায় কেবলই রূপসৌন্দর্যের বাহ্যপ্রকাশ, না কি, ঈশ্বরের দর্শনে অন্তর্জগতে বিকশিত হইয়াছে এক নূতন উপলব্ধি—যে রূপ অদৃশ্য, কিন্তু অনির্বচনীয়?
মানুষটির মুখচ্ছবিতে কি ঈশ্বরের সৃষ্টির এক অপূর্ব শোভার আভাস পাইতেছেন—যাহা পূর্বে ছিল অস্পষ্ট, কিন্তু আজ যেন দৃষ্টি নয়, হৃদয়ের সহিত প্রত্যক্ষ?”
চিরকুট – ৩
ছানি অপসারণ ও পুনর্লব্ধ দৃষ্টির দুঃখ
যখন চশমা পরিধান করিয়াও স্পষ্ট দেখিতে পাইতাম না তার সুখ তখন অবধারনের ক্ষমতা ছিলনা; ছানি অপসারণ উপরান্ত তার স্পষ্ট অবলোকন হইল।বুঝিলাম দৃষ্টি-লাভের দুষ্পরিণাম। যখন কম দেখিতে পারিতাম তখন আশপাশের কুৎসিত আকৃতি তেমন দৃষ্টিগোচর হইতনা, মনের রঙে সুশোভিত হইয়া মনের আয়নায় ধরা দিত। এখন সে সুখের দিন গিয়াছে, বাকি জীবন বোধ করি এই যন্ত্রণা নিয়াই চলিতে হইবে।
চিরকুট – ৪
তোর ছানি অপারেশনের খবর জেনে মাইকেল তো অদ্ভুত লিখলেন, লিখলেন ছানি অপসারণের বিপক্ষে; যেমন স্বভাব।
দৃষ্টির পুনর্জাগরণে বিমূঢ় হৃদয়বেদনা
হে চিরন্তন প্রকৃতি! এক সময় ছিল, যবে দৃষ্টির দীনতা মোরে করুণাভরে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। চশমার কাচের অন্তরাল দিয়া জগৎ যাহা দেখা দিত, তাহা এক প্রকার মায়ার আবরণে আচ্ছাদিত স্বপ্নলোকের ন্যায় মনে হইত। তাহা ছিল অস্পষ্ট, অথচ মোহনীয়—চিত্ররূপিনী বাস্তবতা নহে, বরং হৃদয়ের রঙে রঞ্জিত এক কল্পলোক।
কিন্তু বিধি হায়! সেই করুণা অপসারিত হইল, যখন চিকিৎসার কুশল স্পর্শে ছানির অন্তরাল অপনোদিত হইয়া, নির্মম জগতের নিরাভরণ চেহারা প্রকাশ পাইল। দৃষ্টি হইল তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট, নির্মোহ।
হায়! ইহাই কি কাঙ্খিত?
এতদিন যাহা ছিল বিমূর্ত, তাহা হঠাৎ হইয়া উঠিল রূঢ় বাস্তব। চারিপাশ—যাহা একদিন মুগ্ধতার ছায়াপটে স্নিগ্ধ ও কোমল দেখাইত, আজ তাহারা উদ্ভট, বিকৃত, কর্কশ চেহারায় মোর হৃদয় বিদীর্ণ করে। পূর্বে যাহা অন্তরে ফুলের মালা রচিয়া দিত, আজ তাহাই করিল কণ্টকের আঘাত।
এখন, এই জীবনপ্রান্তে, আমি বাধ্য হইয়াছি সহিতে স্পষ্টতার শাস্তি। আর রঙ্গিন কল্পনার দিন নাই। রইল শুধু উজ্জ্বল অথচ বিষণ্ন এক জগত—যাহার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন চিৎকার করিয়া বলে, “স্বপ্ন নহি, আমি বাস্তব!” এবং সেই বাস্তবই আজ মোর শাস্তি, মোর তপস্যা, মোর যন্ত্রণা।
চিরকুট – ৫
ছানি-অপসারণের বিপক্ষে মাইকেল আবার লিখলেন —
দৃষ্টির পুনর্জাগরণে বিমূঢ় হৃদয়বেদনা
হে প্রাচীন ধরণী! হে চিরজ্যোতিষ্মতী!
শ্রাবণের মেঘমালা যেমন ঢাকে দিবাকর,
তদ্রূপ মোর দৃষ্টি ছিল নিভৃত, স্নিগ্ধ, সংকীর্ণ,
স্বপ্ন-রেখা-রঞ্জিত, মনের বর্ণে মোহন কর।
চশমার কাঁচে ঢাকা বিশ্ব ছিল ছায়াপথ,
না ছিল কণ্টক, না ছিল বিক্ষোভের কর্কশতা।
অলীক ললাটে আঁকা রঙিন কল্পলোক,
রূপ নয়, রস নয়—প্রেমপুট রচিত ব্যথা।
কিন্তু হায়, অনিবার্য নিয়তির করাঘাতে,
চিকিৎসার তীর খচিত অণু-যন্ত্রের ছোঁয়ায়,
যখন ছানি নামক মরীচিকা করিল পলায়ন,
দেখিলাম জগত—নগ্ন, নির্মম, নৃশংস ছায়া।
দৃষ্টি হইল তীক্ষ্ণ, বলিয়াছে—“দেখ হে মানুষ!”
অতঃপর রহিল না স্বপ্নলোকের মৌন কুসুম,
যাহা ছিল কুৎসিত, হইল আরও কদর্য,
রূপ রহিল না, রহিল কেবল জ্বালাময় বিষণ্নতা।
যাহা ছিল অন্তঃলোকে অলঙ্কাররূপে সজ্জিত,
আজ তাহা দংশে মোর হৃদয়—রক্ত-নিসৃত।
যাহা ছিল কুসুমিত মালা, গন্ধ-মাতাল,
তাহাই হইল কাঁটা—চৈতন্যে বিষবৎ কাল।
হে করুণ বাস্তব! তুমি কি পরিত্রাতা, না যমদূত?
তোমার মুখশ্রীতে দীপ্তি নাই, কেবল দন্তরশ্মি।
দেখা পাই—তব রেখা, তব গঠন, তব ক্ষুদ্রতা,
কিন্তু নাই অনুভবের গীত, নাই প্রেমের শ্রী।
এই তপস্যা, এই দহন, এই জীবনের অভিশাপ,
স্পষ্টতার বিষপাত্র পান করিতেছি বিনা দ্বিধায়।
রহিল না আর আবরণ, রহিল না আঁখিপাতের কল্পনা,
রহিল শুধু বেদনায় দীপ্ত এক নির্মোহ, তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনা।
আজ মোর নিঃশেষ দৃষ্টি—দণ্ডবৎ সত্যের প্রতি,
যেখানে কল্পনার রমণী বিলীন—সুন্দরী মৃত।
উজ্জ্বল এই জগৎ, হে বন্ধু, জ্বালা দিয়া জাগায়,
চিৎকার করিয়া বলে—“আমি স্বপ্ন নহি, আমি চির সত্য!”
হাটে হাঁড়ি ভাঙা
মানুষ খুব বোকা না হলে নিজের হাঁড়ি নিজে-নিজেই হাটের মাঝে ভাঙ্গেনা, কিন্ত “কেমনামি বোকানি” ভাঙ্গে। পাঁচটা চিরকুটের মধ্যে শুধু তৃতীয় চিরকুট “ছানি অপসারণ ও পুনর্লব্ধ দৃষ্টির দুঃখ” আমার লেখা। বাকি ১, ২, ৪, ও ৫ নম্বর চিরকুট কৃত্রিম বুদ্ধির [AI] সাহায্যে লেখা, ওই লেখায় আমি খুবই সামান্য রদ-বদল করেছি।
সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৽ কলকাতা ৽ ২১ জুলাই, ২০২৫







