গ্যাসবাতির শহর: ভেতরে – বাইরে
ভোরের আগের সেই সময়
প্রতিটি মহানগরের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ইতিহাস নিজের গলার শক্ত কলারটা আলগা করে।
দিনের বেলা যে শহর মানুষকে মুগ্ধ করার জন্য সাজগোজ করে থাকে, সেই শহর তখন নিজের মুখোশ খুলে ফেলে।
ভিড় থাকে না।
কোলাহল থাকে না।
অট্টালিকাগুলো আর দর্শনার্থীদের জন্য অভিনয় করে না।
নিজেদের প্রকৃত চেহারায় ফিরে আসে।
লন্ডনেরও এমন একটি সময় ছিল।
ভোরের ঠিক আগের সময়।
গ্যাসবাতিগুলো তখনও জ্বলছে, কিন্তু যেন অনিচ্ছায়।
কুয়াশা তখনও আছে, কিন্তু তার শরীর পাতলা হয়ে এসেছে।
রাত এখনো বিদায় নেয়নি।
সকাল এখনো অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি।
শহরটা যেন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মাঝখানে স্থির হয়ে আছে।
সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন একা।
একটি গ্যাসবাতির নীচে।
গতরাতে যেখানে সেই অদ্ভুত সঙ্গীতজ্ঞদের সমাবেশে তাঁর পরিচয় হয়েছিল, সেই চত্বরেরই এক কোণে।
নিজেকে ‘স্মৃতির অভিভাবক’ বলে পরিচয় দেওয়া বৃদ্ধ ভদ্রলোক আর নেই।
অন্যরাও ছড়িয়ে পড়েছে নিদ্রিত শহরের মধ্যে।
শুধু প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে।
অনেক প্রশ্ন।
সঞ্জয় আকাশের দিকে তাকালেন।
আলো ফুটছে।
চিমনির ধোঁয়া ছাদের মাথার উপর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।
দূরে কোথাও গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল।
তার ঠিক পরেই তিনি আর-একটি শব্দ শুনলেন।
শব্দ নয়, যেন অনুভব করলেন।
তানপুরা।
বাস্তবে নয়।
তবু তাঁর সংগীতশিক্ষিত মন নিঃসন্দেহে তাকে চিনে ফেলল।
সা—
অটল।
অচঞ্চল।
সারা শহরের নীচে যেন এক অদৃশ্য শ্রুতি টানা রয়েছে।
তিনি হঠাৎ অদ্ভুত একটি কথা ভাবলেন।
লন্ডন কি নিজেই আজ কোনও বিরাট আসরের আগে সুর মেলাচ্ছে?
ভাবনাটা তাঁর নিজের কাছেই হাস্যকর মনে হল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই হাসি মিলিয়ে গেল।
কুয়াশার ভিতর থেকে সরোদের সুর ভেসে এল।
সেই পরিচিত আহ্বান।
সেই অদৃশ্য পথপ্রদর্শক।
সময়ের দেয়াল ভেদ করে যিনি তাঁকে এখানে এনেছেন।
সুরটা যেন বলছে—
“এসো।”
“আরও ভিতরে এসো।”
“গল্প তো সবে শুরু হয়েছে।”
সঞ্জয় হাঁটতে শুরু করলেন।
লন্ডনে লুকোনো পাওয়া
সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লন্ডন যেন রাতের পোশাক বদলে ফেলল।
এক রাত আগেও যে শহরকে তাঁর স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল, সকালের আলোয় সে হয়ে উঠল বিশাল, ব্যস্ত এবং ভয়ংকরভাবে বাস্তব।
ঘোড়ায় টানা ওমনিবাস ছুটে চলেছে।
দোকানের শাটার উঠছে।
সংবাদপত্র বিক্রেতারা চিৎকার করছে।
কুরিয়াররা ব্যাগভর্তি চিঠি নিয়ে ছুটছে।
প্রত্যেক মোড়ে, প্রত্যেক চত্বরে, রানী ভিক্টোরিয়ার জয়ন্তী উৎসবের পতাকা উড়ছে।
কোথাও বিজয়তোরণ।
কোথাও রাজমুকুটের প্রতীক।
কোথাও বিশাল পোস্টার।
মনে হচ্ছে গোটা সাম্রাজ্য নিজেকে উদ্যাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একটি রথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোর সংবাদবিক্রেতা চিৎকার করছে—
“জুবিলি! জুবিলি! মহারানির জুবিলি!”
সঞ্জয়ের মনে পড়ে গেল কলকাতা।
দুর্গাপুজোর আগে যেমন গোটা শহর হঠাৎ এক অদৃশ্য উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে, তেমনই।
তবে পার্থক্য আছে।
কলকাতার উৎসব মানুষের।
এখানকার উৎসব সাম্রাজ্যের।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি হঠাৎ বুঝতে পারলেন, দৃশ্যমান শহরের নীচে আর-একটি শহর রয়েছে।
একটি অদৃশ্য শহর।
যাকে সাধারণ মানুষ দেখে না।
যার কোনও রাস্তা নেই।
কোনও পৌরসভা নেই।
কোনও মানচিত্র নেই।
তবু তার অস্তিত্ব স্পষ্ট।
এই শহরকে যুক্ত করে রেখেছে সুর।
কোভেন্ট গার্ডেনের চায়ের দোকান
সরোদের সুর তাঁকে নিয়ে এল কোভেন্ট গার্ডেনের কাছাকাছি একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে।
দেখতে একেবারেই সাধারণ।
দু-চারজন ব্যবসায়ী বসে আছে।
একজন ভদ্রমহিলা সংবাদপত্র পড়ছেন।
কয়েকজন যাত্রী চা খাচ্ছেন।
কিছুই অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু ভিতরে ঢুকেই সঞ্জয়ের চোখ আটকে গেল।
দেয়ালে।
একটি পুরো দেয়াল জুড়ে কার্ড টাঙানো।
ভিজিটিং কার্ড।
ডজন ডজন।
শত শত।
কলকাতা।
লখনউ।
রামপুর।
বেনারস।
গোয়ালিয়র।
লাহোর।
মাদ্রাজ।
নামগুলোর দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হল, যেন ভারতবর্ষের সংগীতজগতের একটি মানচিত্র এখানে এসে ঝুলে আছে।
কোথাও উস্তাদের নাম।
কোথাও যন্ত্রনির্মাতার।
কোথাও কোনও জমিদার পৃষ্ঠপোষকের।
কোথাও কোনও গুরুর।
তিনি এত মন দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন যে দোকানের মালিক কখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তা টেরই পাননি।
“খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।”
সঞ্জয় ঘুরে দাঁড়ালেন।
“হ্যাঁ।”
“আপনি বুঝতে পারছেন এগুলো কী?”
“মনে হচ্ছে সংগীতের কোনও গোপন ইতিহাস।”
লোকটি মৃদু হেসে বলল—
“তাহলে আপনি তাদেরই একজন।”
“কার?”
“টুরিস্ট”
সঞ্জয় ভুরু কুঁচকে বললেন—
“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“বুঝবেন।”
লোকটি কাউন্টারের নীচ থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল।
“আজই বুঝবেন।”
“এটা কী?”
“পথনির্দেশ।”
“কোথায় যাব?”
“যেখানে সুর আপনাকে নিয়ে যেতে চায়।”
এই বলে সে আর কোনও কথা বলল না।
কাগজ খুলে সঞ্জয় দেখলেন—
কয়েকটি ঠিকানা।
শুধু ঠিকানা।
কোনও নাম নেই।
কোনও ব্যাখ্যা নেই।
কোনও নির্দেশ নেই।
কিন্তু তিনি জানতেন—
আজকের দিনটি আর সাধারণ থাকবে না।
(চলবে)

