ঝুপ করে সোজা ১৮৮৭


সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় কোনওদিনই পুরনো বাদ্যযন্ত্রকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি।

বাদ্যযন্ত্র খারাপ বলে নয়। বরং উল্টো।

সমস্যা হল, তারা অনেক বেশি মনে রাখে।

মানুষ ভুলে যায়। বাদ্যযন্ত্র ভোলে না।

২০২৬ সালের এক বর্ষার সন্ধ্যায় ঘটনাটা শুরু হয়েছিল।

কলকাতার আকাশ সেদিন যেন জলের সমস্ত সঞ্চয় একসঙ্গে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাড়ির সামনের আমগাছগুলোকে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছিল যে জানলার ওপারে পৃথিবীটা ঝাপসা ধূসর পর্দার আড়ালে মিলিয়ে গিয়েছিল।

নিজের পড়ার ঘরে একা বসে ছিলেন সঞ্জয়।

ঘর জুড়ে বই, গবেষণাপত্র, পুরনো কনসার্টের ব্রোশিওর, বিবর্ণ ফটোগ্রাফ, হাতে লেখা নোট—সারা জীবনের সংগৃহীত স্মৃতি যেন তাক থেকে নেমে এসে চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে।

কম্পিউটারের পর্দায় খোলা ছিল একটি ডিজিটাল আর্কাইভ।

ঊনবিংশ শতকের সংগীতজ্ঞদের নিয়ে সংগৃহীত মৌখিক ইতিহাসের নথি তিনি গোছাচ্ছিলেন।

একটি রেকর্ডিং বারবার তাঁর মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল।

এক বৃদ্ধ সরোদিয়া এক আশ্চর্য কাহিনী বলছিলেন।

রাণী ভিক্টোরিয়ার সিলভার জুবিলি, ওস্তাদ এনায়েত খাঁ, আর এমন এক সরোদ—যার ভিতরে নাকি গোপন যন্ত্রপাতি বসানো আছে বলে একসময় সন্দেহ করা হয়েছিল।

সঞ্জয় মুচকি হেসেছিলেন।

সংগীতশিল্পীদের গল্পের মতো অদ্ভুত জিনিস পৃথিবীতে কমই আছে। শুনলে মনে হয় অসম্ভব। আবার মনে হয়, একমাত্র এটাই সত্যি।

তিনি হেডফোনটা একটু ঠিক করে আবার শুনতে শুরু করলেন।

স্পিকারের ভিতর থেকে বৃদ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“…তারপর তারা স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে এল…”

ঠিক তখনই বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঘরটা এক মুহূর্তের জন্য সাদা হয়ে উঠল।

“…ধাতুর পাত খুলে দেখল…”

বজ্রধ্বনিতে জানলার কাচ কেঁপে উঠল।

“…ভিতরে কিছুই ছিল না…”

হঠাৎ শব্দ বিকৃত হয়ে গেল।

কণ্ঠস্বর বদলে যেতে লাগল।

গভীর।

দীর্ঘ।

প্রতিধ্বনিময়।

সঞ্জয় প্রথমে ভাবলেন হেডফোনে নিশ্চয় গোলমাল হয়েছে।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই আর-একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

এমন কণ্ঠ তিনি আগে কখনও শোনেননি।

নরম।

প্রাচীন।

আর অদ্ভুতভাবে রসিক।

“কিছুই ছিল না?”

কণ্ঠস্বর বলল।

“কে বলল কিছুই ছিল না?”

সঞ্জয় তড়াক করে হেডফোন খুলে ফেললেন।

ঘরে কেউ নেই।

বৃষ্টি পড়ছে।

কম্পিউটারের পর্দা কাঁপছে।

আবার সেই কণ্ঠস্বর।

“সঙ্গীত কখনও শূন্য আর পূর্ণতার পার্থক্য মানতে শেখেনি।”

এবার সত্যিই তাঁর গায়ে কাঁটা দিল।

একজন বিচক্ষণ মানুষ হলে সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটার বন্ধ করতেন।

আরও বিচক্ষণ হলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেন।

সঞ্জয় তার কোনওটাই করলেন না।

বরং পর্দার দিকে ঝুঁকে এলেন।

আর্কাইভের উইন্ডোটি উধাও।

তার জায়গায় একটি ছবি।

প্রথমে মনে হল পুরনো ফটোগ্রাফ।

তারপর বুঝলেন, ছবিটা নড়ছে।

ঘোড়ার গাড়ি চলছে।

গ্যাসবাতি জ্বলছে।

ভিক্টোরিয়ান পোশাক পরা মানুষজন হেঁটে যাচ্ছে।

এ ছবি নয়।

একটি জীবন্ত দৃশ্য।

সঞ্জয়ের বুকের ভিতর ধুকপুক শব্দ বেড়ে গেল।

কম্পিউটারের পর্দার তো গভীরতা থাকার কথা নয়।

কিন্তু এর ভিতর যেন রাস্তা চলে গেছে বহুদূর।

কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে।

দূরে কোনও গির্জার ঘণ্টা বাজল।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—

তিনি সঙ্গীত শুনতে পেলেন।

খুব মৃদু।

একটি সরোদ।

কোথাও যেন বাজছে।

অসীম দূর থেকে।

আবার অদ্ভুতভাবে পরিচিত।

কণ্ঠস্বর ফিরে এল।

“গল্প হল দরজা, প্রফেসর।”

ঘরে ভেজা দেবদারু কাঠ আর পুরনো প্রদীপের তেলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

“কিছু দরজা তখনই খোলে, যখন কেউ মন দিয়ে শুনতে শেখে।”

সরোদের সুর একটু জোরালো হ’ল।

পর্দার ভিতরের কুয়াশা পাক খেতে শুরু করল।

সঞ্জয় এক পা পিছিয়ে যেতে চাইলেন।

কিন্তু মেঝে যেন সাধারণ যুক্তির নিয়ম মানতে রাজি নয়।

পিছোতে গিয়ে তিনি যেন সামনে এগিয়ে গেলেন।

চারপাশের বইয়ের তাক লম্বা হতে লাগল।

দেয়াল বেঁকে গেল।

ঘরটা যেন কাগজের তৈরি হয়ে ভাঁজ খেতে শুরু করল।

এক অসম্ভব মুহূর্তে তিনি নিজেকে দুটি জগতের মাঝখানে ঝুলতে দেখলেন।

লখনউয়ের এক কর্মশালা।

একটি রেল স্টেশন।

রাজকীয় শোভাযাত্রা।

বাদ্যযন্ত্রে সুর মেলাচ্ছেন শিল্পীরা।

কারিগররা যন্ত্রের জোয়ারী  করছেন ।

তার কাঁপছে।

গুরু শিষ্যকে শেখাচ্ছেন।

এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সুর ভেসে যাচ্ছে।

তারপর সব অন্ধকার।

এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল।

তিনি হোঁচট খেয়ে সামনে পড়লেন।

পায়ের নিচে পাথর বাঁধানো রাস্তা।

মাথার উপর গ্যাসবাতি।

বাতাসে কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ।

ঘোড়ার গাড়ি ছুটে যাচ্ছে।

কেউ ইংরেজিতে চিৎকার করছে।

কেউ উর্দুতে জবাব দিচ্ছে।

একটি ছেলেকে দেখা গেল খবরের কাগজ বিক্রি করতে দৌড়চ্ছে।

কাগজের শিরোনাম দেখে সঞ্জয়ের নিঃশ্বাস আটকে গেল—

“HER MAJESTY QUEEN VICTORIA’S SILVER JUBILEE CELEBRATIONS”

নীচে সাল লেখা—

১৮৮৭

(চলবে)

,